প্রযুক্তিমিমের উৎস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মিমের উৎস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় মিমের উৎপত্তি কেবল ইন্টারনেট যুগে নয়। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন, যা সাংস্কৃতিক কথোপকথনের একটি মাধ্যম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ব্যবহারকারীদের কাছে ‘মিম’ একটি পরিচিত শব্দ। এটি মূলত কোনো বিষয়ের হাস্যকর ছবি, ভিডিও বা লেখা, যা মানুষকে বিনোদন দেয়। মিমের মাধ্যমে হাস্যরসের পাশাপাশি ব্যঙ্গও প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি একটি শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মিমের উৎপত্তি বা কীভাবে এটি এসেছে, তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মিম কেবল ইন্টারনেট যুগের সৃষ্টি নয়। মানুষ শত শত বছর ধরে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মিম ব্যবহার করে আসছে। এটি মূলত সাংস্কৃতিক কথোপকথনের একটি মাধ্যম।
ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে প্রথম ‘মিম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তার মতে, মিম হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারা তথ্যের টুকরা। মানুষের একে অপরকে বারবার কিছু বলার বা ভেটকি দেওয়ার প্রবণতা থেকেই এর বিস্তার ঘটে।
ফরাসি ভাষায় ‘মেমে’ শব্দের অর্থ ‘একই’ এবং গ্রিক শব্দ ‘মিমৌমাই’ অর্থ ‘অনুকরণ করা’। ইন্টারনেটে মিম শব্দটি মাইক গডউইন ১৯৯৩ সালে প্রথম ব্যবহার করেন। ডকিন্স আরও বলেন, মানুষের ধারণা, আদর্শ, সংস্কৃতি ও প্রথা নানাভাবে নিজেরাই পুনরুৎপাদিত হয়।
এগুলো অনেকটা ভাইরাসের মতো অনুকরণ হয় এবং শেয়ার ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অনুভূতি, চিন্তা, ধারণা বা নিছক কৌতুকের দৃশ্যগত রূপকে মিম বোঝানো হয়। এসব বিষয় অবশ্য খ্রিষ্টপূর্ব তিন অব্দ থেকে কোনো না কোনো আকারে দেখা গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রাচীন অ্যান্টিওক শহরের একটি স্থানে তিনটি ফ্রেমে বিভক্ত একটি মোজাইক আবিষ্কার করেছেন। এই মোজাইকে একটি গোসলের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বলে মনে হয়। প্রথম ফ্রেমে একজন ভৃত্য গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দ্বিতীয় ফ্রেমে এক তরুণ গোসল করা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং এক বয়স্ক ভৃত্য তাকে ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে।
শেষ দৃশ্যে আনন্দিত তরুণ বেপরোয়া কঙ্কাল এক জারের ওয়াইন সামনে অলস ভঙ্গিতে বসে রয়েছে। তার নিচের শিলালিপিতে খোদাই করা আছে, "আনন্দ করো, জীবন উপভোগ করো"। এই গল্পের অন্তর্নিহিত বার্তাটি এমন, "আপনাকে কীভাবে বাঁচতে হবে, তা কাউকে বলতে দেবেন না! যা ইচ্ছা তা–ই করুন, কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে মরতেই হবে।"
এই মোজাইকের ছবি ইতিহাসের আদি ওয়াইওএলও (YOLO) বলে মনে করা হয়। ইংরেজিতে ওয়াইওএলও বহুল ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ ‘আপনি একবারই বাঁচবেন’। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কম্পিউটার চালাতে বা সিরির সঙ্গে কথা বলতে জানতেন না, কিন্তু তাঁদেরও নিজস্ব মিম ছিল। এই মিমগুলো আজও সারা বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে কিলরয়ের ছবি দেখা যায়, যার দীর্ঘ নাক ও বোঁচা বা মস্তকবিহীন অবয়ব অনেক স্থানেই ছিল। এই ছবির উৎপত্তি নিয়ে নানা মিথ ও কিংবদন্তি থাকলেও সত্যি হলো, কিলরয় ঠিক কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না। কিংবদন্তি বলে, এর উৎপত্তি জাহাজ পরিদর্শক জেমস কিলরয়ের মাধ্যমে, আবার অন্য একটি মতে ফ্রান্সিস কিলরয় নামের এক সেনা কর্মীর কথা বলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈনিকদের লড়াইয়ের সময় কিলরয় চিহ্ন বেশি জনপ্রিয় হয়। জার্মানিরা মনে করত, কিলরয় হয়তো কোনো আসল গুপ্তচর, যিনি সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। কিলরয় ছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া এক মিম। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিমোর শিফম্যান ইন্টারনেট মিম নিয়ে গবেষণা করেন।
শিফম্যান বলেন, ডিজিটাল মিম অনন্য, কারণ এগুলো কেবল একটি একক ধারণা নয়। এসব একে অপরের সম্পর্কে সচেতন থেকে তৈরি করা ধারণার একটি সমষ্টি। ‘পেপে দ্য ফ্রগ’-এর কথাই ধরা যাক। এই চরিত্রটি ‘ফিলস গুড ম্যান’ নামের ডকুমেন্টারির তারকা।
পেপে নিজে থেকে একটি সহজ-সরল ব্যাঙ হলেও তার ছবি থেকে তৈরি মিম শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ইন্টারনেট মিম সম্পর্কে শিফম্যান বলেন, এসব মিম সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ডিজিটাল কনটেন্টের একক। ব্যবহারকারীরা একে অপরের সচেতনতায় এগুলো তৈরি করেন।
অনেক ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে এসব মিম প্রচার করে। ব্যবহারকারীরাই নির্ধারণ করে দেন কোন মিম জনপ্রিয় হবে। ইন্টারনেট মিমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়, তবে মিমের টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ।
‘ড্যান্সিং বেবি’ নামের নাচের শিশুর মিম ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। অনেকেই একে প্রথম ডিজিটাল মিম বলে মনে করেন। এটি ডাউনলোড করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। ২০০০ সালের পরে ইন্টারনেটভিত্তিক চ্যাটরুমের জনপ্রিয়তা বাড়লে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মিম জনপ্রিয়তা লাভ করে।
মতামত (0)