ইসলাম মানুষকে সম্মান ও চিন্তার স্বাধীনতা প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ইসরা’র ৭০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, "আমি তো আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছি; আর আমি আমার সৃষ্টিজগতের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।" এই আয়াত মানবজাতির সহজাত মর্যাদা ও স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করে। মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করেছে এবং আল্লাহ তাকে ভালো ও মন্দের পথ চেনার ক্ষমতা দিয়েছেন। এই মৌলিক বিশ্বাসই নির্দেশ করে যে ইসলামে কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি বা মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নেই। এটি ইসলামের একটি মূল বার্তা।
ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগেও সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপক সুযোগ ছিল। সাহাবিরা প্রয়োজনে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক করতেন এবং রাসুল (সা.) কখনোই তাঁদের কণ্ঠরোধ করেননি। এই পরিবেশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। নিচের কয়েকটি ঘটনা এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
খাউলা বিনতে সা’লাবার স্বামী তাঁকে ‘জিহার’ করেছিলেন, যা তৎকালীন জাহেলি সমাজে তালাকের একটি বিশেষ ও নির্মম রূপ ছিল। এই প্রথার অধীনে স্বামী স্ত্রীকে নিজের মায়ের পিঠের মতো হারাম ঘোষণা করত। রাসুল (সা.) খাউলাকে জানান যে, এই ঘোষণার পর তিনি তাঁর স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গেছেন। কিন্তু খাউলা (রা.) এতে দমে যাননি; তিনি বারবার নবীজির কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন এবং আল্লাহর কাছে ব্যাকুলভাবে দোয়া করছিলেন। তিনি তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এই প্রথা বাতিল হওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কথা শোনেন এবং সুরা মুজাদিলার শুরুতে আয়াত নাজিল করেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে, "আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে তোমার (নবীজির) সঙ্গে বাদানুবাদ করছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথা শুনছেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" পরবর্তী আয়াতগুলোতে (২-৪) জাহেলি যুগের এই নিষ্ঠুর প্রথা বাতিল করে বিবাহ বিচ্ছেদের বদলে কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহালের বিধান দেওয়া হয়। এটি ছিল নারীর মতপ্রকাশের অধিকারের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
বদর যুদ্ধের সময় নবীজি (সা.) একটি নির্দিষ্ট স্থানে থামার সিদ্ধান্ত নেন। সাহাবি হুবাব ইবনে মুনজির (রা.) তখন নবীজিকে জিজ্ঞাসা করেন, এই অবস্থান কি আল্লাহর নির্দেশে হচ্ছে, নাকি এটি যুদ্ধের কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) স্পষ্ট করে বলেন যে, এটি যুদ্ধের কৌশল। এরপর হুবাব (রা.) নিজের ভিন্ন মত তুলে ধরেন এবং শত্রুদের পানির কাছাকাছি গিয়ে ক্যাম্প করার পরামর্শ দেন, যা কৌশলগতভাবে অধিক সুবিধাজনক হতে পারত। নবীজি (সা.) হুবাবের যুক্তিটি মনোযোগ দিয়ে শোনেন, সেটি পছন্দ করেন এবং বলেন, "তুমি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছ।" এরপর রাসুল (সা.) হুবাবের পরামর্শ অনুযায়ী সাহাবিদের নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেন। (উয়ুনুল আসার ১/২৯৩) এই ঘটনা সামরিক কৌশল নির্ধারণেও পরামর্শ ও ভিন্ন মতের গুরুত্ব তুলে ধরে।



মতামত (0)