ধর্মখলিফা আবু বকরের ইন্তেকাল এবং পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া
খলিফা আবু বকরের ইন্তেকাল এবং পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) তার সংক্ষিপ্ত শাসনকালের পর ইন্তেকাল করেন। তার বিদায়ের পূর্বে তিনি উমর (রা.)-কে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করার জন্য একটি সুচিন্তিত ও শুরা-ভিত্তিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন।
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মাত্র দুই বছর তিন মাসের শাসনকালে আরবে স্বধর্মত্যাগ ও গৃহযুদ্ধের আগুন নিভিয়ে এক অখণ্ড রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অভ্যন্তরীণ সংহতি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি রোমান ও পারস্য পরাশক্তির সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সিরিয়া ও ইরাকের দিকে বিজয়ের যাত্রা শুরু করেন। রাষ্ট্র যখন স্থিতিশীলতার মুখ দেখতে শুরু করে, ঠিক তখনই তাঁর জীবনের শেষ প্রহর ঘনিয়ে আসে।
প্রথম খলিফা আবু বকরের বিদায় ছিল ক্ষমতা, জনমত, পরামর্শ (শুরা) এবং জনগণের আমানতের ব্যাপারে এক অনন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর (রা.)-এর মনোনয়ন ছিল খোলামেলা ও সর্বজনীন ‘শুরা’ প্রক্রিয়ার ফলাফল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আর-রায়িস ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে পরবর্তীকালের রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে আবু বকরের এই পদক্ষেপের কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং এটি জনমতের ভিত্তিতেই গৃহীত এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ ছিল।
আবু বকর (রা.) উমর সম্পর্কে সকলের নিরপেক্ষ মতামত জানতে চেয়েছিলেন। ছোটখাটো মেজাজের কঠোরতা ছাড়া নেতৃত্ব ও যোগ্যতার প্রশ্নে সবাই উমরের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন। খলিফা আবু বকর (রা.) রোগশয্যায় উপলব্ধি করেছিলেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। নেতৃত্ব নিয়ে যাতে মুসলিমদের মাঝে নতুন করে কোনো অনৈক্য তৈরি না হয়, সেজন্য তিনি তিনটি ধাপে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের পথ তৈরি করেন।
প্রথম ধাপে, অসুস্থতা গুরুতর রূপ নিলে আবু বকর (রা.) জনগণকে একত্র করেন। তিনি নিজের ওপর অর্পিত বায়াত থেকে সবাইকে মুক্ত ঘোষণা করে বলেন, “তোমরা দেখতে পাচ্ছ আমার কী অবস্থা হয়েছে। আমার মনে হয় বিদায়ের সময় সমাগত। আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে আমার বায়াতের অঙ্গীকার প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং তোমাদের ক্ষমতা তোমাদের হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে যাকে খুশি নেতা বানিয়ে নাও। আমার জীবদ্দশায় যদি তোমরা এ বিষয়ে একমত হতে পারো, তবে আমার পরে তোমাদের মধ্যে আর কোনো বিভেদ সৃষ্টি হবে না।” ইবনে আসাকিরের তথ্য অনুযায়ী, তিনি এই ঘোষণা দেন।
দ্বিতীয় ধাপে, খলিফার এই বক্তব্যের পর সাহাবিরা নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা করেন। কিন্তু তাঁরা কোনো একক ব্যক্তির ব্যাপারে একমত হওয়ার চেয়ে গৃহবিবাদের আশঙ্কা করেন। ফলে তাঁরা পুনরায় খলিফার কাছে এসে অনুরোধ জানান, ‘আপনিই আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নিন।’ খলিফা তখন তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি যদি কারও নাম প্রস্তাব করি, তবে কি তোমরা তাতে মতবিরোধ করবে?’ সবাই সমস্বরে ‘না’ বলেন। আবু বকর (রা.) তখন বলেন, ‘তবে আমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর ধর্ম ও বান্দাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটু অবকাশ দাও।’
তৃতীয় ধাপে, তিনি তৎকালীন শীর্ষ সাহাবি ও নীতিনির্ধারক (আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ)—যেমন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, ওসমান ইবনে আফফান, উসাইদ ইবনে হুদাইর এবং সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.)-সহ আনসার ও মুহাজির নেতাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আবু বকর (রা.) নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর আগে যেন তাঁর কাঁধে মুসলিমদের কোনো অন্যায্য সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে। গবেষক ও চিন্তাবিদ আলি আত-তানতাবি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের তাৎপর্য তুলে ধরে লিখেছেন যে উমর (রা.)-এর এই মনোনয়ন স্বৈরতান্ত্রিক কোনো ফরমান ছিল না; বরং তা শুরার সবচেয়ে বিশুদ্ধ, ইনসাফপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল।
ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষেত্রে, সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি কন্যা আয়েশাকে নিজের ব্যক্তিগত একটি খেজুরবাগান দান করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় এসে কন্যার হাত ধরে বলেন, “মা, আমি তোমাকে যে জমিটুকু দিয়েছিলাম, তা নিয়ে আমার মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। তুমি যদি তা পরিবারের সকল ওয়ারিশের সাধারণ উত্তরাধিকারের মাঝে ফিরিয়ে দাও, তবে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।” আয়েশা (রা.) পরম শ্রদ্ধায় পিতার সেই জমি ফিরিয়ে দেন, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য কোনো সন্তান বা ওয়ারিশ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত না হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা বায়তুল মালের ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা ছিল অবিশ্বাস্য। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ব্যক্তিগত কোনো বেতন নিতেন না; শুধু রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনার স্বার্থে বায়তুল মাল থেকে তাঁকে একজন খাদেম এবং বাগানে সেচ দেওয়ার জন্য একজন কর্মচারী দেওয়া হতো।
মতামত (0)