আন্তর্জাতিকনেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধান
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধান
নেপাল-চীন সীমান্তে বারবার ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কারণ হিসেবে ভৌগোলিক গঠন, অতিবৃষ্টি, তুষারধস ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে।
নেপাল-চীন সীমান্তে ভৌগোলিক গঠন, অতিবৃষ্টি, তুষারধস এবং হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের কারণে নদী প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বারবার ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস ঘটছে। স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, এত বড় মাত্রার কোনো ঘটনা তারা এর আগে কখনো দেখেননি।
গত বুধবার সকালে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এই বন্যার কারণ ছিল রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশী-ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়া। কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের মতো এবারও ত্রিশূলী নদীর বন্যার উৎপত্তি নেপালের ভূখণ্ডে নয়, বরং তিব্বতে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
বুধবার সকালে বন্যার পানি নেপালের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রধান ধর্মরাজ উপ্রেতি বলেন, উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং এর ফলে ওই অঞ্চলে সামগ্রিকভাবে যে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে, সেগুলোই এর পেছনে থাকা প্রধান কারণ।
ডিপার্টমেন্ট অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ও মুখপাত্র বিভূতি পোখারেল বলেছেন, এই ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, তারা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন এবং ঠিক কী ঘটেছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পুলচোক ক্যাম্পাসের ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাডিজের দুর্যোগবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত অধিকারী বর্তমানে চীনের সিচুয়ানে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটির বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হচ্ছে, এটি তুষারধসের কারণে ঘটে থাকতে পারে। পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়ায় ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বসন্ত অধিকারী আরও বলেন, নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের ফল পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। গত বুধবারের ঘটনার ক্ষেত্রে লেন্দখোলায় তুষারধসের কারণে পানির প্রবাহ আটকে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বন্যার আগে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পানির স্তর কমে যাওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
নেপাল ও চীনের মধ্যকার উত্তর সীমান্তজুড়ে উঁচু হিমালয় পর্বতমালা রয়েছে। সীমান্তের ওপারে তিব্বত মালভূমি অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও সেগুলো থেকে সৃষ্ট হিমবাহ-হ্রদ এবং নেপালের দিকের পানিপ্রবাহ সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত, হিমবাহের পরিবর্তন এবং তুষারধস একসাথে ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচু এলাকার দিকে নেমে আসে।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ ঠাকুরি বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায়, বিশেষ করে তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহের আকস্মিক ধস ও তুষারধস সম্ভাব্য জলবায়ুগত ও ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ। তিনি আরও বলেন, নেপালের দিকে খাড়া ভূপ্রকৃতিতে জনবসতি, সড়ক, সেতু, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে তিব্বতে তুষারধস বা হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণের ঘটনা মাঝেমধ্যে নেপালের নিচু এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণজনিত বন্যা এবং তুষারধস নিয়মিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তুষারধস হলো বরফের ভূমিধস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনো কখনো খাড়া ঢাল বেয়ে বড় বড় বরফের খণ্ড বা পাথর নিচে নেমে এলে সেগুলো হ্রদ ভেঙে দিতে পারে, এমনকি নদীর প্রবাহও বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে মৌসুমি দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
সহযোগী অধ্যাপক ঠাকুরি হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণ বা তুষারধসের মতো ছোট আকারের মৌসুমি ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে করেন না। তবে গত বুধবারের বন্যাকে তিনি বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে তারা যেসব ভিডিও দেখেছেন, সেগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বড় ধরনের ঘটনা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় নদীর পানির উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ মিটার বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
গত বছরও রাসুয়া অঞ্চলে বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভৌগোলিক গঠন, হিমবাহ-হ্রদের অবস্থানের নিয়মিত পরিবর্তন এবং বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে বারবার আকস্মিক দুর্যোগ ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
মতামত (0)