আন্তর্জাতিক

নেপাল-চীন সীমান্তে হ্রদ উপচে নতুন বন্যার আতঙ্ক, পাহাড়ে ছুটছে মানুষ

নেপাল-চীন সীমান্তে হ্রদ উপচে নতুন বন্যার আতঙ্ক, পাহাড়ে ছুটছে মানুষ
নেপাল-চীন সীমান্তে হ্রদ উপচে নতুন বন্যার আতঙ্ক, পাহাড়ে ছুটছে মানুষ
নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট একটি অস্থায়ী হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে, এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি অস্থায়ী হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার এ ঘটনায় ওই অঞ্চলে নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই বন্যায় বিপর্যস্ত এলাকাগুলোয় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

গত বুধবার হিমবাহ ও বরফ-শিলা ধসের পর বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীতে নেমে আসে। এতে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে এই অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়। হ্রদের পানি উপচে ভুটেকোশি নদীতে পড়তে শুরু করেছে।

বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। নেপালে ৪৮৯ জন এবং চীনের তিব্বতে ৫ জন নিহত হয়েছেন। দুই দেশ মিলিয়ে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফ-শিলা ধসের পর সৃষ্ট বিপুল পানির স্রোতের সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে নদী উপত্যকায়। এতে নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, তানাহুনসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গ্রাম ও উপত্যকাগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট এবং সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে।

কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা সড়ক এবং তীর্থযাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি সড়কও ধ্বংস হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী। তাঁরা তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

শুক্রবার পর্যন্ত হ্রদে জমা পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এর পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার। নেপালের বন্যাকবলিত রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানান, হ্রদের পানি উপচে পড়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়া গেছে।

নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ঠিক কতটা পানি বেরিয়ে এসেছে বা হ্রদটির পানির উচ্চতা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। কোট জেলায় হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি উপচে বের হয়ে যাচ্ছে বলে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর আতঙ্কিত মানুষ উঁচুতে উঠে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছেন।

পানি বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অনেকে উঁচু এলাকায় ছুটে যান। নদীর কাছাকাছি না যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাইকে সবাইকে নদী থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। পুলিশ সদস্যদের দড়ি ও স্ট্রেচার নিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

৪০ বছর বয়সী শান্তি তামাং বলেন, "সবাইকে 'পালাও' বলে সতর্ক করা শুরু হলে আমিও দৌড় দিলাম। বিদুর শহরের সাইরেনও বেজে উঠেছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।" উদ্ধারকর্মীদেরও তাঁদের সরঞ্জামসহ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছিল।

নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কায় নেপাল ও চীনের উদ্ধারকর্মীদেরও সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। নেপালে প্রায় ৯০ মিনিট উদ্ধারকাজ বন্ধ থাকার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হলে তা আবার শুরু হয়। চীনের তিব্বতেও উদ্ধারকর্মী ও যানবাহন নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে রাখা হয়েছিল।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, সাহায্যের প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে তাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত অন্য কোনো দেশের সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলে নেপাল জানিয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলে চীনের সব উদ্ধারকারী কর্মী ও যানবাহনকে পিছু হটে নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। পরে ‘উজানের নদীর মাধ্যমে হ্রদের ঝুঁকিটি সামলানো সম্ভব বলে মনে হওয়ায়’ উদ্ধারকাজ আবার শুরু করা হয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সভাপতিত্বে বেইজিংয়ে শুক্রবার চীনের পলিটব্যুরো বৈঠক করে। সভায় বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ‘বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং চীন ও বিদেশের নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।’

বৈঠকে বলা হয়, উদ্ধারকাজ ‘অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জের’ মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদ, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক বাঁধের নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়। নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানানো হয়।

নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বেঁচে যাওয়া মানুষদের খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন শহর ও উপত্যকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষের জন্য আকাশপথে জরুরি ত্রাণ সরবরাহ করা হয়। জরুরি পরিষেবা দলগুলো সমতল ভূমিতে ভেসে আসা বহু মরদেহ উদ্ধার করেছে। অনুসন্ধানী দলে কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাসুয়া থেকে দিবগা তামাং নামের একজনসহ আরও তিনজনকে উদ্ধার করে এয়ারলিফটে নুয়াকোটের একটি সেনাক্যাম্পে নেওয়া হয়। তামাং বলেন, "আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। সবাই মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। সবকিছু ও সবাই শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ।"

নতুন করে তৈরি হওয়া হ্রদটির পানি ও ভুটেকোশি নদীর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আকস্মিকভাবে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ইতিমধ্যে বন্যায় বিপর্যস্ত নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোয় আবারও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...