আন্তর্জাতিক

জেন-জি আন্দোলন: তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিবাদ

জেন-জি আন্দোলন: তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিবাদ
জেন-জি আন্দোলন: তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিবাদ
জেন-জি আন্দোলন কোনো একক সংগঠন নয়, বরং বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের একটি সামগ্রিক পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এই প্রজন্ম রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

‘জেন-জি আন্দোলন’ কোনো একক সংগঠন বা সুনির্দিষ্ট প্রতিবাদের নাম নয়। এটি বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের একটি সম্মিলিত পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম এখন ডিজিটাল জগৎ পেরিয়ে রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

বিশ্বের নানা প্রান্তে তরুণেরা দুর্নীতি, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, সরকারি সেবার দুর্বলতা, রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। জেন-জি আন্দোলনের শিকড় সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন তরুণ-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে ছড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও কেনিয়ার ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর এটি বৈশ্বিকভাবে বিশেষ পরিচিতি ও স্বীকৃতি লাভ করে।

জেন-জি আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ব্যানার বা প্রথাগত নেতৃত্বের অধীন নয়। ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, মিম, ছোট ভিডিও এবং ডিজিটাল প্রচারণাকে তারা হাতিয়ার করে। তরুণেরা অভাবনীয় দ্রুততায় সংগঠিত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় ক্ষোভগুলোকে শক্তিশালী জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিচ্ছে।

২০২০ সালে থাইল্যান্ডে তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের দাবিতে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়। জাইল্যান্ডের ঘটনাকে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পূর্বসূরি হিসেবে প্রায়ই আলোচনা করা হয়।

একই বছর হংকংয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা আইনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণে আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। এশিয়ার তরুণদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার ধারাবাহিকতায় হংকংয়ের ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন শুরু হয়। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই বিক্ষোভ দ্রুত ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নারীর অধিকার, সামাজিক স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন সরকারি বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে তরুণদের বড় অংশ আন্দোলনে যুক্ত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে এবং এটি বৃহত্তর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশের আন্দোলনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং অনলাইনভিত্তিক সমন্বয় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়।

২০২৪ সালের জুনে কেনিয়ায় সরকারের প্রস্তাবিত ফাইন্যান্স বিলের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। কর বৃদ্ধির প্রস্তাবের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো বিষয়ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়ে তরুণরা রাজপথে নেমে আসে। ২৫ জুন আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন। ব্যাপক চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ফাইন্যান্স বিল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। নভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর সরকারের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশের দাবি আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রে ছিল।

২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় তরুণদের মধ্যে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ দেখা যায়। এই অসন্তোষও বিভিন্ন প্রতিবাদে রূপ নেয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...