আন্তর্জাতিকনেপালে আকস্মিক বন্যায় ২৮৮ ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ, চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপালে আকস্মিক বন্যায় ২৮৮ ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ, চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তঘেঁষা তিমুরে এলাকায় আকস্মিক বন্যায় ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সাথে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর বহু পর্যটক রয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তঘেঁষা তিমুরে এলাকায় ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সাথে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নেপালে আকস্মিক বন্যার পর উদ্ধার অভিযান জোরালোভাবে চলছে।
নেপালের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ৮২৬ জন ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ৫৭৯ জন বিভিন্ন দেশের পর্যটক। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ভারত ছাড়াও ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।
এর আগে নিখোঁজ থাকা ২১ জন ভারতীয় পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কলকাতা থেকে যাওয়া দুজন পর্যটকও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিখোঁজদের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া বহু পর্যটক আছেন। এর মধ্যে ৩২ সদস্যের একটি কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের দলও রয়েছে, যারা কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। এই দলে ৩০ জন তীর্থযাত্রী এবং দুজন ট্যুর ম্যানেজার রয়েছেন বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেছেন, আকস্মিক বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে দলের ৩২ জন সদস্যের কারো সাথেই যোগাযোগ করা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ সংস্থাগুলো তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।
কলকাতা মেট্রোরেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী রণজিৎ কুমার হাওলাদার (৬৩) এই পর্যটকদের মধ্যে একজন। তিনি বেহালার পর্ণশ্রী অঞ্চলের বাসিন্দা। তার স্ত্রী গায়ত্রী হাওলাদার জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে তিনি শেষবারের মতো স্বামীর সাথে কথা বলেছিলেন।
গায়ত্রী হাওলাদার বলেন, তার স্বামী জানিয়েছিলেন যে, রাতটা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টের উদ্দেশে রওনা দেবেন। তিনি ঘুরে বেড়াতে ভীষণ ভালোবাসতেন, আর এটি ছিল তার স্বপ্নের গন্তব্যগুলোর একটি। রেলওয়ে থেকে ২০২৩ সালে অবসরের পরই এই তীর্থযাত্রায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
রণজিৎ কুমার হাওলাদারের মেয়ে সুনন্দা, যিনি মুম্বাইয়ে কর্মরত, গতকাল (বৃহস্পতিবার) সকালে কলকাতায় ফিরে এসেছেন। আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়ার পর তিনি গতকাল সকাল থেকে নিখোঁজ বাবার সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন। তিনি থানায় এবং ভ্রমণ সংস্থার অফিসে খোঁজ নিয়েছেন, কিন্তু কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি।
সুনন্দা বলেন, ভ্রমণ সংস্থার প্রতিনিধিরা তাদের জানিয়েছেন যে, তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত দুজন নারী পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বাকি পর্যটকদের বিষয়ে তারা কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। তিনি আরও জানান, গত বুধবার রাতে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে এসেছিলেন বাবার সফর-সংক্রান্ত তথ্য জানতে, কিন্তু তারাও কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সুনন্দা আরও বলেছেন, এই সফরে তারও বাবার সাথে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কর্মস্থল থেকে ছুটি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি যাত্রায় যোগ দিতে পারেননি।
নিখোঁজ এবং নেপালে দুর্যোগের কারণে আটকে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের এক দম্পতি এবং অন্য একটি পরিবারও আছে। এছাড়াও হুগলি জেলার তারকেশ্বরের বাসিন্দারাও রয়েছেন। তারা গত ২১ আগস্ট নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অরিন্দম গাঙ্গুলি, তার স্ত্রী মৌসুমী গাঙ্গুলি, এবং তাদের মেয়ে অঙ্কিতা গাঙ্গুলি নিখোঁজ রয়েছেন। অরিন্দম ও মৌসুমী দুজনেই দামোদর ভ্যালি করপোরেশন বা ডিভিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। দুর্গাপুরের আরেক দম্পতি দেবাশিস ব্যানার্জী ও সংঘমিত্রা ব্যানার্জীও এই পর্যটক দলের অংশ, তাদের সাথেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। হুগলির তারকেশ্বরের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী স্নেহাশিস দত্ত ও জয়ন্ত সান্যালও নিখোঁজ। জয়ন্ত সান্যাল কলকাতার পর্যটন সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা।
এই নিখোঁজ ব্যক্তিরা রাসুয়া থেকে ইমিগ্রেশন করে তিব্বতে প্রবেশ করার কথা ছিল। শিলিগুড়ি ও পশ্চিমবঙ্গের অন্য কয়েকটি অঞ্চল থেকেও কয়েকজন নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তামিলনাড়ু থেকে যাওয়া ৮৬ জন পর্যটক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যদিও তামিলনাড়ুর ২১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল বলেছেন, তামিলনাড়ুর দুটি দলের সাথে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই দুটি দলে যথাক্রমে ৩৭ ও ৪৯ জন আছেন এবং তারাও তিব্বতের মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন।
মতামত (0)