রাজনীতিনির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ৯ দফা দাবি জানাল জামায়াত
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ৯ দফা দাবি জানাল জামায়াত
ইসির সঙ্গে বৈঠকে ৯ দফা দাবি জানাল জামায়াত | প্রথম আলো
ইসির সঙ্গে বৈঠকে ৯ দফা দাবি জানাল জামায়াত
আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০: ৪১
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। আজ বুধবার নির্বাচন কমিশনে
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তাদের নয় দফা দাবি পেশ করেছে, যার মধ্যে ইসির অতিরিক্ত সচিব পদে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দলটির পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এই দাবিগুলো জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে অনুষ্ঠিত এক সভায় উত্থাপন করে, যেখানে তিনি ইসির সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
জামায়াতের দাবিগুলোর মধ্যে আরও ছিল, যেসকল রাজনৈতিক দল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাদের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি ও আলোচনার বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার এবং সিনিয়র সচিবও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের নিয়োগ ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তিনি জানান, সামসুল আলম পূর্বে বিএনপির নির্বাচনী আসন পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ছিলেন এবং এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া যেকোনো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই নিয়োগ সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে জামায়াত অভিযোগ করেছে।
জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তাদের জানিয়েছে যে তারা সামসুল আলমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জানত না এবং তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সরকার দিয়েছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এর তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়, এই নিয়োগ নিয়ে ইসির আপত্তি জানানো উচিত ছিল, যা তাদের অসহায়ত্ব, অক্ষমতা ও অপারগতার ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করার সাম্প্রতিক প্রস্তাবের বিষয়েও জামায়াত আপত্তি জানিয়েছে, কারণ তাদের মতে জাতীয় নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলে স্থানীয় নির্বাচনে এটি বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। ইসি অবশ্য বিষয়টি আলোচনা করে দেখবে বলে জামায়াতকে আশ্বস্ত করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার দাবিও তারা ইসির কাছে পুনরুত্থাপন করেছেন। তার যুক্তি হলো, ব্যক্তির নির্বাচন করাও এক প্রকার রাজনীতি, তাই নিষিদ্ধ দলের কোনো ব্যক্তির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। একইসাথে, তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানান, কারণ তার মতে, স্বল্প সময়ের জন্য প্রশাসক হিসেবে কাজ করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া মানেই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ হতে না দেওয়া। এটি দলীয়করণের একটি প্রক্রিয়া এবং এর ফলে নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট ও অস্বচ্ছ হবে।
জামায়াতের এই নেতা চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের গেজেট সর্বোচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার দিনই ইসির প্রকাশ করার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসি স্বাক্ষরিত আদেশ আসার জন্য অপেক্ষা না করেই গেজেট জারি করে শপথের ব্যবস্থা করে দেয়, যা রাজনৈতিক চাপের ফল। তার মতে, ইসির কর্মকর্তারা সরাসরি স্বীকার না করলেও তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বোঝা যায় যে তারা চাপের মুখে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। জামায়াত মনে করে, ইসি একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাধর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে, যা তারা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকারও করেছে।
এই নয় দফা দাবি উত্থাপনের ঘটনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং তাদের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি অংশ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে, এবং জামায়াতের এই পদক্ষেপ সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন। বিশেষ করে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং নির্বাচনকালীন সময়ে ইসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব দাবির বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, তবে তাদের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই দাবিগুলো যদি ইসি বিবেচনা করে, তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা এবং প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে, যদি দাবিগুলো অগ্রাহ্য করা হয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা আরও বাড়তে পারে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের পথে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের পুলিশের বাধার মুখে পড়ার ঘটনা এবং হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি সামনে এসেছে, যেখানে এনসিপির নেতারা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে দলীয়করণ করে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। একইভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একটি সাংস্কৃতিক সমাবেশের অনুমতি বাতিল করে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জামায়াতের উত্থাপিত উদ্বেগের সঙ্গে একধরনের সমান্তরাল চিত্র তুলে ধরে।
জামায়াতের এই নয় দফা দাবি, বিশেষত ইসির অতিরিক্ত সচিবের নিয়োগ বাতিল এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রাখার বিষয়টি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা যে তারা কীভাবে এসব দাবিকে মোকাবিলা করে এবং নিজেদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই পদক্ষেপগুলোই আগামী দিনে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর জনগণের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথচলায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
মতামত (0)