রাজনীতিনির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ: সর্বোচ্চ ব্যয় জামায়াতের, ২৭ দলের শূন্য
নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ: সর্বোচ্চ ব্যয় জামায়াতের, ২৭ দলের শূন্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০টি দল অংশ নেয়। ৪৯টি দলের ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে ইসি। ২৭টি দল কোনো টাকা খরচ করেনি বলে জানিয়েছে। | প্রথম আলো
সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় দেখাল জামায়াত, বিএনপি কত
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৭: ১৫
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে ৪৯টি দলের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৭টি দল কোনো টাকা খরচ করেনি বলে ইসিকে জানিয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরদিন নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়। আইন অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে দলীয় ব্যয় বিবরণী জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ১৩ মে।
নির্বাচন কমিশন গত ২৬ জুলাই ৪৯টি দলের নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। তবে দলগুলো কোন খাতে কত টাকা খরচ করেছে, সেই বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। শুধুমাত্র দলভিত্তিক মোট ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তারা গত নির্বাচনে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অন্যদিকে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে সরকার গঠন করা বিএনপি প্রায় ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা খরচ দেখিয়েছে।
সংসদ নির্বাচনে দুই ধরনের নির্বাচনী ব্যয় হয়ে থাকে। এর একটি প্রার্থীর নিজস্ব ব্যয় এবং অন্যটি দলের ব্যয়। একজন প্রার্থী কত টাকা খরচ করতে পারবে, তার সীমা ওই আসনের ভোটার সংখ্যার ওপর নির্ধারিত হয়। প্রার্থীরা তাদের ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেন।
রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মনোনীত একজন প্রার্থীকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা অনুদান দিতে পারে। এছাড়া প্রচারসহ অন্যান্য খাতেও দলগুলো ব্যয় করতে পারে। দলের প্রার্থীর সংখ্যার ওপর দলীয় মোট ব্যয়সীমা নির্ভর করে। দলগুলো তাদের ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো দলের প্রার্থী সংখ্যা ২০০ জনের বেশি হলে তারা সর্বোচ্চ সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ করতে পারে। প্রার্থীর সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ জনের মধ্যে হলে তিন কোটি টাকা ব্যয়সীমা নির্ধারিত থাকে। ৫১ থেকে ১০০ জন প্রার্থী থাকলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম প্রার্থী থাকলে ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারে।
গত সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি ২৯১ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। তাদের জন্য সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ করার সুযোগ ছিল। তবে দলটি যে হিসাব দিয়েছে, তাতে তারা ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা খরচ করেছে।
জামায়াতে ইসলামী ২২৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। তারা দলীয় ব্যয় দেখিয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়ে ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭১ টাকা খরচ করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়ে ৩২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। তারা দলীয় খরচ দেখিয়েছে ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দলীয়ভাবে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৩ টাকা খরচ করেছে।
অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা, এবি পার্টি ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭১০ টাকা, গণ অধিকার পরিষদ ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং জাতীয় পার্টি ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা খরচ দেখিয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) পাঁচ লাখ টাকার কম খরচ দেখানো দলগুলোর মধ্যে রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ২৭টি দল ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। বাকি দলগুলোকে হিসাব জমা দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন ১৪ জুন পর্যন্ত বাড়তি সময় দিয়েছিল। বর্ধিত এই সময়ের মধ্যে বিএনপিসহ ১৬টি দল তাদের হিসাব জমা দেয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বাকি সাতটি দল ব্যয় বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৬ জুন তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হলে ইসি সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করে ৩০ দিনের মধ্যে বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
এরপরও হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান সাপেক্ষে আরও ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করতে পারে ইসি। এরপরেও হিসাব বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা ইসির রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলগুলোর দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব কতটা সঠিক বা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ যে জাতীয় নির্বাচনের আগে বড় দল এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের ব্যবসায়ীরা মোটা অঙ্কের ‘ডোনেশন’ দেন।
সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেছেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ব্যয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। তিনি আরও বলেছেন, প্রার্থী ও দল ইসিতে যে হিসাব জমা দেয়, তা যাচাই করা প্রয়োজন। অন্তত দৈবচয়নের ভিত্তিতে কিছু কিছু যাচাই করে দেখা উচিত।
ইসি কখনো প্রার্থী ও দলের ব্যয়ের হিসাব সঠিক কি না তা খতিয়ে দেখে না। ফলে প্রার্থীরা ও দল যে ব্যয়ের হিসাব দেয়, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি বলে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ।
মতামত (0)