সারাদেশঅভাব জয় করে জিপিএ-৫ অর্জন, সংবর্ধনায় আবেগাপ্লুত নুজহাতী
অভাব জয় করে জিপিএ-৫ অর্জন, সংবর্ধনায় আবেগাপ্লুত নুজহাতী
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সাফল্য পাওয়া শিক্ষার্থী নুজহাতী নুর তার জীবনের গল্প শোনান, যা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আজ বুধবার সকালে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দালাল বাজার ফাতেমা গার্লস হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী নুজহাতী নুর তার সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, অভাব-অনটনের মধ্যে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবার একটি ছোট চায়ের দোকান ছিল এবং ২০১৫ সালে বাবা মারা যান।
নুজহাতী জানান, বাবার মৃত্যুর সময় তিনি প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবাকে হারিয়ে মা ছোট বোন ও তাকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন। সেই থেকে তারা অভাব কী জিনিস তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে তাদের দিন কেটেছে। পড়ার জন্য কোনো টেবিলও ছিল না। মামারা কৃষিকাজ করেন এবং মাঝেমধ্যে সামান্য সহযোগিতা করেছেন। মামাদের সহযোগিতা ও মায়ের অদম্য চেষ্টায় কোনো রকমে তার পড়াশোনা চলেছে।
নুজহাতী নুর বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়া তার জন্য অনেক বড় একটি অর্জন। তিনি এটিকে কেবল নিজের নয়, তার মায়েরও সাফল্য বলে অভিহিত করেন।
আজ সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুরের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেঘ কেটে গিয়ে সূর্যের তাপ বাড়তে থাকে। গরম ও প্রখর রোদ সত্ত্বেও কৃতী শিক্ষার্থীরা দমে যায়নি।
সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন চত্বর শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে। সকাল ৯টা বাজতেই শিক্ষার্থীদের হইহুল্লোড় ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি উৎসবে রূপ নেয়। অনুষ্ঠানে জেলার প্রায় সাড়ে চার শ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের সাথে এসেছিলেন কয়েক শ অভিভাবকও।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন স্থানীয় প্রতিনিধি। তিনি সম্পাদকের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আজকের এই মঞ্চ থেকে শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকালে আশাবাদী হতে ইচ্ছা করে। তাদের আগামী দিনের বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের অর্জন কেবল পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি পুরো জেলার জন্য গর্বের।
লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, সাফল্যের পথে অনেক বাধা আসবে এবং পথ কঠিন মনে হতে পারে। সেই মুহূর্তে আজকের দিনটির কথা মনে রাখতে বলা হয়। সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামাতে পারে, তবে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে তা অতিক্রম করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে মঞ্চে আসেন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান। তিনি বলেন, আজকের এই মঞ্চ থেকে শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকালে আশাবাদী হতে ইচ্ছা করে। তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ।
মাইন উদ্দিন পাঠান আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অর্জন কেবল তাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি পুরো জেলার জন্য গর্বের। সাফল্যের পথে বাধা এলেও আজকের দিনটির কথা মনে রাখতে হবে। সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামাতে পারলেও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে তা অতিক্রম করা সম্ভব।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক হাসিবুল ছিদ্দিক তার বক্তব্যে বলেন, আজকের এই অর্জন শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে জিপিএ-৫ তাদের গন্তব্য নয়, এটি কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি সিঁড়ি।
অধ্যাপক হাসিবুল ছিদ্দিক আরও যোগ করেন, প্রত্যেকের মধ্যেই সম্ভাবনা আছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হতে হবে।
শিক্ষিকা খোদেজা খাতুন, যিনি লক্ষ্মীপুর কলেজিয়েট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের চোখে যে আনন্দ দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে মা-বাবার নির্ঘুম রাত, শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং তাদের নিজেদের ত্যাগ।
খোদেজা খাতুন বলেন, প্রত্যেককে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। সেই স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্যও হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের গল্প যেন একদিন আরও অনেক শিশুকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়।
অনুষ্ঠানে হেড অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতান শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে না বলার শপথবাক্য পাঠ করান। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভার সদস্য মোহাম্মদ সেলিম মুন্সি।
বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুসভার সদস্যরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে হাজির হন। অনুষ্ঠানে এসে অনেক শিক্ষার্থী সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
মতামত (0)