সারাদেশ

শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাত তিন দশকেও থামেনি

শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাত তিন দশকেও থামেনি
শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাত তিন দশকেও থামেনি
শেরপুরের গারো পাহাড়ে তিন দশক ধরে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যেখানে ২০১৪ সাল থেকে ৩৪ জন মানুষ ও ৩১টি হাতি প্রাণ হারিয়েছে।

শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত তিন দশক ধরে চলছে। ১৯৯৬ সালের দিকে শুরু হওয়া এই সংকট আজও সীমান্তের পাহাড়ি জনপদকে তাড়া করে ফিরছে। একের পর এক সভা-সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবে সংঘাত কমেনি। সোলার ফেন্সিং স্থাপন, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন এবং হাতির খাদ্য উপযোগী বৃক্ষরোপণ করা হলেও হাতির হানা, ফসলহানি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাতে ৩৪ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে ৩১টি হাতি মারা গেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব হাতির বেশিরভাগই মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে। তিন দশকের নানা উদ্যোগের পরও মানুষ ও হাতি উভয় পক্ষই এই সংঘাতের বলি হচ্ছে।

প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যা নামলেই খাবারের সন্ধানে হাতির পাল গভীর অরণ্য থেকে লোকালয়ে নেমে আসে। এসব হাতি ধান, শাকসবজি, কলাগাছ, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছ নষ্ট করে। তারা গোলার ধান-চাল খেয়ে ও পায়ে মাড়িয়েও ক্ষতি করে এবং কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলে। ফলে সন্ধ্যার পর সীমান্তের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক নেমে আসে।

হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে ফসল ফলাতে চান না। ঝুঁকি নিয়ে চাষ করলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই হাতির পাল হানা দিয়ে তা নষ্ট করে দেয়। স্থানীয়রা সামনে ধানের মৌসুমে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন।

সংঘাত নিরসনে ২০১৪ সালে তাওয়াকোচা ও বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ এলাকায় হাতির খাদ্যের জন্য বাঁশ, কলাগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পর এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। একই সময়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সোলার ফেন্সিং স্থাপন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থাপনের পর দীর্ঘদিন ধরে সেটিও অকেজো পড়ে আছে। কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের এমন পরিণতিতে প্রশ্ন উঠেছে, পরিকল্পনা ও অর্থব্যয়ের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এত ফারাক কেন?

হাতির আক্রমণ থেকে মানুষকে সতর্ক করতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ১০টি ইআরটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে ১০ জন সদস্য রয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাওয়া যায় না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলে গ্রামবাসীরাই ঝুঁকি নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। হাতি তাড়ানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। মাঝে মধ্যে জেলা পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে টর্চলাইট বিতরণ করা হলেও দুর্গম ও দরিদ্র হাতিকবলিত এলাকার অনেক মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন বিভাগের প্রায় ২১ হাজার একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার একর বেদখলে আছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বেদখল জমির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার একর। এসব বেদখল জমিতে শত শত ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে এবং চাষাবাদ চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাতির জন্য স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই বনভূমি দখলমুক্ত করতে হবে। বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল নিরাপদ করা না গেলে সংঘাত কমানো কঠিন।

দীর্ঘ ৩০ বছর পর এবার গারো পাহাড়ে বন্যহাতির জন্য অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি গত শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে শেরপুর জেলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এক সেমিনারে নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল। এতে বন বিভাগের কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, পুলিশ, বিজিবি, ইআরটি সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।

সেমিনারে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, মানুষের নিরাপত্তা, ফসল ও বসতবাড়ি রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর পর অভয়ারণ্য ও খাদ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন— তিন দশক ধরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, একের পর এক প্রকল্প ও সভা-সেমিনারের পরও যদি মানুষ-হাতির সংঘাত থামানো না যায়, তাহলে এতদিনের উদ্যোগের সুফল গেল কোথায়? তাঁদের মতে, এবার আর কাগুজে পরিকল্পনা নয়; প্রয়োজন বাস্তবায়ন। হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল চিহ্নিত করে নিরাপদ অভয়ারণ্য ও পর্যাপ্ত খাদ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কার্যকর ক্ষতিপূরণ এবং সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারিও নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...