ধর্ম

কুরআনের আলোকে মানসিক স্বাস্থ্য ও মানব মনস্তত্ত্বের রূপরেখা

কুরআনের আলোকে মানসিক স্বাস্থ্য ও মানব মনস্তত্ত্বের রূপরেখা
কুরআনের আলোকে মানসিক স্বাস্থ্য ও মানব মনস্তত্ত্বের রূপরেখা
মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের মৌলিক ভিত্তি। আধুনিক মনস্তত্ত্বের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে ইসলাম শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক মাত্রার সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রদান করে।

মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এটি অনেক সময় মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, মানসিক অস্বস্তি এবং অসন্তুষ্টির মতো সমস্যাগুলো আধুনিক সমাজকে গ্রাস করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, মানসিক স্বাস্থ্য হলো এমন এক মানসিক সুস্থতার অবস্থা যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জীবনের স্বাভাবিক চাপগুলো মোকাবিলা করতে পারে, কার্যকরভাবে শিখতে ও কাজ করতে পারে এবং সমাজে ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পারে।

তবে, তত্ত্বগতভাবে অনেক মানুষই সঠিক ও সুন্দর মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী নন। নানা কারণে তাদের মন ও মানসিকতা অসুস্থ, ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্থির। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে মনস্তত্ত্বকে কেবল পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণ এবং জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, সেখানে ইসলাম শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক মাত্রার সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা বা সামগ্রিক রূপরেখা প্রদান করে।

প্রচলিত মনস্তত্ত্বের দার্শনিক ভিত্তি একসময় "আত্মার অনুসন্ধান" থেকে শুরু হয়েছিল। কালক্রমে এটি কেবল মানুষের চিন্তা ও বাহ্যিক আচরণের পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে, যার কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি সম্পূর্ণভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং ঐশী নির্দেশনা বা কুরআনকে উপেক্ষা করেছে।

আধুনিক মনস্তত্ত্ব কেবল মানুষের দৃশ্যমান ও জাগতিক আচরণকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এটি মানুষের আধ্যাত্মিক ও অদৃশ্য জগৎকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে। মানুষের অস্তিত্ব শরীর, মন এবং আত্মার সমন্বয়ে গঠিত।

আমাদের আত্মার জন্য আধ্যাত্মিক খোরাকের প্রয়োজন, যা অর্জিত হয় ঈমান, আল্লাহর স্মরণ (জিকির) এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। তাছাড়া, প্রচলিত মনস্তত্ত্বের অধিকাংশ তত্ত্ব ও গবেষণা বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র বা সীমিত নমুনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের মূল উৎস হলো পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাও এর একটি অপরিহার্য অংশ। ইসলামী মনস্তত্ত্বকে "ইলমুল নাফস" বলা হয়, যার আভিধানিক অর্থ হলো আত্ম বা মনের বিদ্যা।

কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই না হলেও এতে এমন চিরন্তন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নির্দেশনা রয়েছে যা আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্য চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, কুরআন তিলাওয়াত ও তা মনোযোগ দিয়ে শোনা উদ্বেগ হ্রাস, মনোযোগ বৃদ্ধি এবং আবেগীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: "যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)। কুরআনকে বিশ্বাসীদের জন্য একটি আরোগ্য (healing) এবং রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমরা কুরআনে এমন কিছু নাজিল করি যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও রহমত..." (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২)। তিনি আরও বলেন: "হে মানবকুল! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশ এবং তোমাদের অন্তরে যে ব্যাধি রয়েছে তার নিরাময়..." (সূরা ইউনুস, ১০:৫৭)। আজকের ব্যস্ত ও অস্থির জীবনে ঈমান ও আশার সাথে কুরআনের আয়াতগুলোকে তিলাওয়াত ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা মানসিক রোগের এক পরম ঔষধ।

মনস্তত্ত্বের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো মানুষের আবেগ (Emotion)। মানুষের আচরণ ও চিন্তার বৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে এই আবেগ। ইসলাম আবেগগুলোকে আল্লাহর দেওয়া অন্যতম বড় নেয়ামত হিসেবে দেখে।

মানুষের হাসি, কান্না, আনন্দ ও চিন্তার ক্ষমতাকে মহান আল্লাহ নিজেই সৃষ্টি করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে: "এবং তিনিই (আল্লাহ) হাসান ও কাঁদান (অর্থাৎ আনন্দ ও দুঃখের উৎস)।" (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৪৩)। কুরআনে প্রধান প্রধান মানবিক আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণের চমৎকার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

ভালোবাসা মানুষের একটি সহজাত অনুভূতি। তবে ইসলামের বিধান হলো, কোনো মানুষ বা পার্থিব বস্তুকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের চেয়ে বেশি ভালোবাসা যাবে না। অতিরিক্ত পারিবারিক মোহ বা সম্পদের ভালোবাসা যেন আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়ে কুরআনে সতর্ক করা হয়েছে।

ভয় একটি নেতিবাচক আবেগ হলেও এটি মানুষকে ক্ষতি ও বিপদ থেকে রক্ষা করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষের একমাত্র ভয় ও পরম শ্রদ্ধা কেবল আল্লাহর প্রতিই থাকা উচিত। মানুষ মূলত সৃষ্টিগতভাবেই ধৈর্যহীন। বিপদে পড়লে সে হাহাকার করে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...