ধর্মমুসলিম মনীষীদের পীঠস্থান: প্রাচীন নিশাপুরের গৌরবময় ইতিহাস
মুসলিম মনীষীদের পীঠস্থান: প্রাচীন নিশাপুরের গৌরবময় ইতিহাস
ঐতিহাসিক শহর নিশাপুর দীর্ঘ ছয় শতাব্দী ধরে জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, যেখানে বহু মুসলিম মনীষী জ্ঞানচর্চা করেছেন।
খোরাসান অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ নিশাপুর মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত শহর। দীর্ঘ ছয় শতাব্দী ধরে এটি ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। আব্বাসীয় শাসনামলে শহরটি বাণিজ্য ও জনপদের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।
তবে নিশাপুরকে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয় ৫৪০ হিজরিতে (১১৪৫ খ্রিস্টাব্দ) এক ভূমিকম্পের কারণে। এরপর ঘুজ উপজাতি এবং ৬১৮ হিজরিতে (১২২১ খ্রিস্টাব্দ) মঙ্গোলদের আক্রমণের ফলে এর ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ণতা পায়।
একটি শহরের পরিচয় সাধারণত তার প্রাসাদ বা বাজারের মাধ্যমে হলেও, নিশাপুরের ক্ষেত্রে তা ছিল ভিন্ন। এর পরিচয় লুকিয়ে ছিল মসজিদের দারসবাড়ি, মুহাদ্দিসদের মজলিশ এবং পাণ্ডুলিপিতে ভরা গ্রন্থাগারে। খোরাসানের এই নগরী একসময় এমন এক জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও আলেমরা জ্ঞানার্জনের জন্য সমবেত হতেন।
ইয়াকুত আল-হামাবি নিশাপুরকে খোরাসানের অন্যতম সমৃদ্ধ নগর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই শহরটি ছিল গুণীজন ও পণ্ডিতদের উৎস। (মু’জামুল বুলদান, ৫/৩৩১–৩৩৩) নিশাপুরের প্রকৃত মহত্ত্ব তার ভৌগোলিক অবস্থানে ছিল না, বরং সেখানে গড়ে ওঠা জ্ঞান-পরম্পরায় নিহিত ছিল।
নিশাপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্ব এতটাই ছিল যে, শহরটির আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে আলাদা ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হয়েছিল। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী ৩২১ হিজরিতে নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। হাদিসশাস্ত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য।
আল-হাকিম নিশাপুরের আলেমদের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তার রচিত গ্রন্থটি এই নগরের আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চার একটি সুবৃহৎ দলিল ছিল। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৫) সাধারণত কোনো শহরের ইতিহাসে শাসকদের নাম বেশি প্রাধান্য পেলেও, নিশাপুরের ক্ষেত্রে আলেমদের নামই শহরের ইতিহাসের প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।
হাফিজ হাকিমের জীবন নিশাপুরের জ্ঞান-পরিবেশের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। জাহাবি তার জীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে, আল-হাকিম প্রায় দুই হাজার শায়খের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করেছিলেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৪) একজন আলেমের শিক্ষাজীবনে একটি শহরে এত বিপুলসংখ্যক শায়খের উপস্থিতি সেই শহরের জ্ঞানচর্চার গভীরতা নির্দেশ করে।
নিশাপুরে হাদিস শেখা ছিল একটি দীর্ঘ পরম্পরা। একজন ছাত্র শায়খের কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে অন্য শায়খের কাছে যেতেন এবং পরে সেই জ্ঞান নিজের ছাত্রদের কাছে পৌঁছে দিতেন। আল-হাকিমের জ্ঞান-ঐতিহ্য তার ছাত্রদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ছিলেন ইমাম আবু বকর আল-বাইহাকি।
আল-বাইহাকি হাকিমসহ বহু মুহাদ্দিসের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/১৬৩–১৭০) পরবর্তী সময়ে বাইহাকি হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান ইমামে পরিণত হন। তার বিভিন্ন গ্রন্থ মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, এবং এভাবেই শহরের জ্ঞান ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে।
পঞ্চম হিজরি শতকে নিশাপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে নতুন মোড় আসে। এই সময়ে আবির্ভূত হন আবুল মা‘আলি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ আল-জুওয়াইনি। তিনি নিশাপুরকে তার জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। (তাবাকাতুশ শাফেয়িয়াতিল কুবরা, ৫/১৬৫–১৬৬)
একপর্যায়ে হিজাজে অবস্থানের কারণে তিনি ‘ইমামুল হারামাইন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। পরে নিশাপুরে ফিরে এলে তার দরসেই আবু হামিদ আল-গাজালি জ্ঞান অর্জন করেন। গাজালি জুওয়াইনির দরস থেকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যান।
আল-গাজালি পরবর্তীতে ফিকহ, উসুল, কালাম, দর্শন ও আত্মশুদ্ধির প্রশ্নকে এক বিস্তৃত চিন্তাকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন। নিশাপুরের জ্ঞানচর্চা শুধু ব্যক্তিগত বা মজলিশে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজামুল মুলকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় ইমাম জুওয়াইনি শিক্ষকতা করেন।
জ্ঞান এখন একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে। শিক্ষক, ছাত্র, নির্দিষ্ট দরস ও আবাসনের ব্যবস্থা মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়। তাহিরি শাসকদের সময়ে নিশাপুর খোরাসানের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
ইবনু হাওকাল লিখেছেন যে, তাহিরিরা কেন্দ্র স্থানান্তর করার পর শহরের আবাদ, আয়তন ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়। (সুরাতুল আরদ, পৃষ্ঠা ৪৩৬–৪৩৭) তবে সমৃদ্ধির সঙ্গে বিপর্যয়ও এসেছিল। সেলজুক যুগে ঘুজদের আক্রমণ এবং ৬১৮ হিজরিতে মঙ্গোল বাহিনী খোরাসানে প্রবেশ করলে নিশাপুর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে।
মতামত (0)