ধর্মঅপচয়ের কারণে মানবজীবনে যেসব প্রভাব দেখা যায়
অপচয়ের কারণে মানবজীবনে যেসব প্রভাব দেখা যায়
ইসলামে সংযম ও ভারসাম্য বজায় রেখে আল্লাহর নেয়ামত উপভোগের নির্দেশনা রয়েছে। অপচয়ের কারণে মানবজীবনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায়, যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং পরকালীন জবাবদিহিতা।
ইসলাম মানুষের জীবনকে কৃচ্ছ্রসাধনের অন্ধকারে আবদ্ধ না করে বৈধ স্বাচ্ছন্দ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। তবে সেই অনুমতির সঙ্গে শিখিয়েছে সংযম ও ভারসাম্য। মানুষ আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করবে, খাবে, পরবে ও ব্যয় করবে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই সীমা অতিক্রম কিংবা অপচয় করবে না। মানবজীবনে অপচয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
অপচয়ের একটি বড় প্রভাব হলো মহান আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া। একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সম্পদ, সম্মান বা ক্ষমতার চেয়েও রবের ভালোবাসা অধিক মূল্যবান। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১) এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা অপচয়বিরোধী ইসলামি দর্শনের মূল কথা তুলে ধরে।
অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শয়তান মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার প্রবণতা সৃষ্টি করতে চায়। অপচয় মানুষকে এমন এক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায় যেখানে সে প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ মূল্য না দিয়ে অবহেলায় তা নষ্ট করে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭) এই আয়াতে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলার মাধ্যমে অপচয়ের চরিত্রগত বিপজ্জনক দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।
নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা অপচয়ের আরেকটি গুরুতর প্রভাব। একটি খাদ্য কণার পেছনে অগণিত মানুষের পরিশ্রম ও আল্লাহর অপরিসীম করুণা জড়িত থাকে। এই বোধ যার অন্তরে জাগ্রত থাকবে, তার বিবেক কোনো কিছু নষ্ট করতে সায় দেবে না। আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, “তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব আর তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭) কেবল মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা প্রকৃত কৃতজ্ঞতা নয়, নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহারই প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। অর্থসম্পদের অপচয় অকৃতজ্ঞতারই বাহ্যিক রূপ। অপচয়ের অভ্যাস কখনো কখনো এমন এক জীবনদর্শনে পরিণত হয়, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষাই মানুষের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
মানুষ যখন কোনো অনুগ্রহের যথাযথ মূল্য দেয় না, তখন তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিহাসে বহু জাতি প্রাচুর্য ও ক্ষমতা পেয়েও তা অকৃতজ্ঞতার ফলে সংরক্ষণ করতে পারেনি। পবিত্র কোরআনে এসেছে, “এটি এ কারণে যে আল্লাহ কোনো জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি তা পরিবর্তন করেন না।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ৫৩) অপচয় কোনো সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করলে তার ক্ষতি কেবল দু–একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য নষ্ট হলে খাদ্যের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, পানির অপব্যবহার করলে পানিসংকট তৈরি হয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অসংযত ব্যবহারে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়। ব্যক্তিপর্যায়ের অসচেতনতা তখন সামষ্টিক বোঝায় পরিণত হয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
প্রাচুর্যের মোহে পড়ে আখিরাতবিমুখ হয়ে পড়াও অপচয়ের একটি প্রভাব। জীবনের সব অর্জন যদি ভোগবিলাস ও প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে আখিরাতের প্রস্তুতি ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে থাকে। অপচয় কখনো কখনো মানুষের অন্তর থেকেও জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে বিস্মৃত করে দেয়। আল্লাহ বলেছেন, “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফিল করে রেখেছে, এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে গেছ।” (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২)
মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে সে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। উপার্জনের উৎস যেমন প্রশ্নের বিষয়, তেমনি ব্যয়ের খাতও জবাবদিহির অন্তর্ভুক্ত। নবীজি (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, (তার মধ্যে একটি হলো) তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭) পবিত্র কোরআনে আরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, “তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯) এই হাদিস ও আয়াত মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরকালীন দায়বদ্ধতাকেও যুক্ত করে দিয়েছে। অপচয়ের ক্ষেত্রে এ জবাবদিহির অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাতে ব্যয় করা বৈধ হলেও তা সব সময় প্রশংসনীয় হয় না।
মতামত (0)