সারাদেশ

অসুস্থ শাহজাহানের ঘরে খাবার নেই, দুই মাসের ভাড়া বাকি

অসুস্থ শাহজাহানের ঘরে খাবার নেই, দুই মাসের ভাড়া বাকি
অসুস্থ শাহজাহানের ঘরে খাবার নেই, দুই মাসের ভাড়া বাকি
রাজধানীর আদাবরে ৯০ বছর বয়সী শাহজাহান মিয়া এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ। রিকশা চালাতে না পারায় তাঁর উপার্জন বন্ধ, ঘরে খাবার নেই এবং দুই মাসের ঘরভাড়া বাকি পড়েছে। তিনি স্ত্রী ও তিন নাতি নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।

রাজধানীর আদাবর এলাকায় ৯০ বছর বয়সী শাহজাহান মিয়া এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ। এই কারণে তিনি রিকশা নিয়ে বের হতে পারছেন না। ফলে তাঁর সামান্য উপার্জনও বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল রবিবার বিকেলে তাঁর স্ত্রী রেনু বেগম জানান, আজও তাঁদের পরিবার না খেয়ে আছে।

শাহজাহানের স্ত্রী রেনু বেগম খাবার জোগানোর চেষ্টা করছেন। দুপুরে তিনি আশপাশের মানুষদের কাছে খাবার চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। তাই দুপুরে পরিবারসহ তাঁদের খালি পেটে থাকতে হয়েছে।

রেনু বেগম রাতের খাবারের চিন্তায়ও উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, কেউ খাবার দিলে রান্না হবে, না দিলে আজও তাঁদের খালি পেটে থাকতে হবে। রাতের খাবারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "জুটলে খাবু, না জুটলে না খাবু।"

গত ২৬ আগস্ট বিকেলে আদাবর থানার সামনের রিংরোড সড়কে শাহজাহান মিয়াকে প্যাডেল রিকশা নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সারা দিন রিকশা চালিয়ে সেদিন তাঁর আয় হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা। দুপুরের খাবারও তিনি খেতে পারেননি।

ওই ১৫০ টাকা থেকে রিকশার মালিককে ১০০ টাকা দিতে হতো। হাতে থাকত মাত্র ৫০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাড়ির জন্য কিছু খাবার কেনার কথা ছিল, কিন্তু কী কিনবেন, তা ঠিক করতে পারছিলেন না তিনি।

কথা প্রসঙ্গে শাহজাহান মিয়া জানান, প্রায়ই এক বেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয় তাঁদের। কখনো ঘরে খাবার না থাকলে প্রতিবেশীদের কাছে চেয়ে নিতে হয়। সেদিনও তাঁর চিন্তা ছিল, রাতে পরিবারের সবাই কী খাবেন।

পরে আদাবরের সুনিবিড় হাউজিংয়ে শাহজাহানের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, এটি এক কক্ষের একটি আধাপাকা ঘর। ঘরে একটি খাট, কয়েকটি পাতিল এবং কয়েকটি ব্যাগে কিছু কাপড় ছাড়া প্রয়োজনীয় আর কোনো জিনিস নেই। তখন রান্না করার মতো চাল-ডাল, আলু-তরকারি কিছুই ছিল না।

শাহজাহানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রেনু বেগম (৬৫) এবং তাঁদের মেয়ের তিন সন্তান থাকে। শিশু তিনটির বয়স যথাক্রমে ১১, ৮ ও ৫ বছর। দুই বছর আগে অজানা অসুখে শাহজাহানের মেয়ের মৃত্যু হয়। এরপর গত বছর মারা যান সেই মেয়ের স্বামী, যিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

মেয়ের মৃত্যুর পর তিন শিশুর দায়িত্ব এসে পড়ে শাহজাহান মিয়ার ওপর। শিশুদের দাদা-দাদি তাদের দায়িত্ব নিতে রাজি না হওয়ায় বয়স ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও নাতিদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়েছে।

শাহজাহানের নিজের এক ছেলে আছেন। তিন বছর আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়ে তিনি আলাদা করে দিয়েছিলেন। ছেলেটিও অসুস্থ, তাই মা-বাবার তেমন খোঁজ নিতে পারেন না। কখনো কখনো উল্টো বাবার ঘরে এসে খাবার খান।

ফলে সংসারের উপার্জনের প্রধান ভরসা ৯০ বছরের শাহজাহান মিয়া। বয়সের কারণে তিনি আগের মতো রিকশা চালাতে পারেন না। প্যাডেলে জোর না পাওয়ায় ধীরে চালান। যাত্রীরাও তাঁর রিকশায় কম ওঠেন। শাহজাহান বলেন, "এই রিকশা চলে কম। মানু উঠতে চায় না। মিশিনেরডা চলে বেশি।"

তারপরও তাঁকে প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বের হতে হয়। কারণ, রিকশা না চালালে ঘরে খাবার আসে না। সেদিন শাহজাহানের কথায় অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছিল। তিনি বলেছিলেন, "টেকা না থাকলে খাব কী, দেড় শ টেকা মারছি, মহাজনের কী দেব, বাড়িতে কী নেব।"

শুধু দৈনিক আয়ের টানাটানিই নয়, তাঁর ওপর ঋণের চাপও রয়েছে। দুই বছর আগে ছিনতাইকারীরা তাঁর রিকশা নিয়ে গিয়েছিল। সেই রিকশার মূল্য পরিশোধ করতে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছিল। সুদসহ অল্প অল্প করে তিনি এখনো সেই টাকা শোধ করছেন।

সংসারের অভাব কিছুটা কমাতে শাহজাহানের স্ত্রী রেনু বেগম কাজ করতেন। সুনিবিড় হাউজিংয়ের একটি নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিকদের রান্না করে তিনি মাসে ৫ হাজার টাকা পেতেন। দুই মাস ধরে ভবনটির কাজ বন্ধ থাকায় তাঁর আয়ও বন্ধ।

এর মধ্যে তাঁদের দুই মাসের ঘরভাড়াও বাকি পড়েছে। এক কক্ষের এই ঘরটির মাসিক ভাড়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা। দুই মাসে বকেয়া হয়েছে ৭ হাজার টাকা। রেনু বেগম জানেন না, এই টাকা কীভাবে দেবেন।

রেনু বেগম বলেন, "মালিক কইছে ভাড়া না দিলে তালা দেবু।" একদিকে খাবারের অভাব, অন্যদিকে ঘর হারানোর ভয়। তিন নাতিকে নিয়ে এরপর কোথায় যাবেন, সেই চিন্তাও তাঁর রয়েছে।

তিনি নিজের খাবারের কথা ভুলে নাতিদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। রেনু বেগম বলেন, "চেষ্টা করি বাবা, নিজে না খাইয়াও ছোট বাচ্চাগো খাওয়াতে।" তিন শিশুর পর্যাপ্ত জামাকাপড়ও নেই। তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করা যায়নি। শাহজাহানের নিজের পরনের কাপড়ও ছেঁড়া।

গত ২৬ আগস্ট শাহজাহানের পরিবারের খোঁজ পাওয়ার পর সেদিন ও পরে মোট দুই দফায় তাঁদের জন্য চাল, ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে কয়েক দিনের খাবারের সংস্থান হলেও তাঁদের অভাব কাটেনি। ঘরভাড়া এখনো বাকি। ঋণও আছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...