একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং তামাক নিয়ন্ত্রণসহ নানা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
একসময় তার ধারণা ছিল, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পুষ্টি সম্পর্কে তার মোটামুটি জানা হয়ে গেছে। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি বুঝতে পেরেছেন, সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হয়তো তখনও বাকি ছিল।
তার দুই ছেলে ছোটবেলায় শাকসবজি কিংবা মাছ খেতে চাইত না। কর্মব্যস্ত জীবনের কারণে প্রতিদিন তাদের সঙ্গে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না তার পক্ষে।
তাদের খুশি রাখতে, সময় বাঁচাতে এবং অনেকটা অজান্তেই তিনি প্যাকেটজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস, কোমল পানীয়, বিস্কুট ও বিভিন্ন প্রসেসড খাবার তাদের পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যুক্ত করেন। তখন তার বিশ্বাস ছিল, বড় প্রতিষ্ঠানের তৈরি খাবার নিশ্চয়ই নিরাপদ; দামি মানেই ভালো; আর আধুনিক প্যাকেজিং মানেই পুষ্টিকর।
তবে তিনি এখন উপলব্ধি করছেন, এই বিশ্বাসের পেছনে ছিল বিজ্ঞাপনের শক্তিশালী প্রভাব, তথ্যের ঘাটতি এবং তাদের অজ্ঞতা।
সম্প্রতি প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কতামূলক পুষ্টি লেবেল বা ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর একটি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে কাজ করতে গিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
গবেষণা, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে তিনি জানতে পারেন, এক প্যাকেট চিপসের মধ্যেই প্রায় দুই দিনের সমপরিমাণ লবণ লুকিয়ে থাকে।
এছাড়াও, ২৫০ মিলিলিটারের একটি কোমল পানীয়ের বোতলে প্রায় ১০ চামচ চিনি থাকে। এই তথ্যগুলো তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এতদিন ধরে ভালো জেনে নিশ্চিন্তে ও গর্বভরে সন্তানদের হাতে যে খাবারগুলো তুলে দিয়েছেন, তা আসলে স্থূলতা এবং ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের এক একটি নীরব বিষ বলে তিনি বুঝতে পারেন।
একজন অভিভাবক হিসেবে দোকানে দাঁড়িয়ে তিনি কখনো বুঝতে পারেননি, যে চিপসের প্যাকেটটি সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন, তাতে কতটা লবণ রয়েছে; কিংবা যে কোমল পানীয় কিনে দিচ্ছেন, তাতে কত চিনি লুকিয়ে আছে। কারণ, বাজারে তথ্যের ভারসাম্য নেই।
উৎপাদক তার পণ্যের প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে জানলেও ভোক্তা তা জানে না। এই তথ্যগত বৈষম্যের সুযোগেই একটি বিপজ্জনক খাদ্যসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ আজ অসংক্রামক রোগের এক নীরব মহামারির সম্মুখীন। দেশের অধিকাংশ মৃত্যু এখন হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটছে।



মতামত (0)