স্বাস্থ্য

আলঝেইমারের প্রোটিন 'বীজ' শনাক্ত করলেন জাপানি বিজ্ঞানীরা

আলঝেইমারের প্রোটিন 'বীজ' শনাক্ত করলেন জাপানি বিজ্ঞানীরা
আলঝেইমারের প্রোটিন 'বীজ' শনাক্ত করলেন জাপানি বিজ্ঞানীরা
জাপানের বিজ্ঞানীরা আলঝেইমার রোগের জন্য দায়ী একটি প্রোটিন গুচ্ছ, 'পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটা' শনাক্ত করেছেন, যা মস্তিষ্কে প্রোটিন জমার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই আবিষ্কার রোগটির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

জাপানের একদল বিজ্ঞানী আলঝেইমার রোগের নেপথ্যে থাকা একটি বিশেষ প্রোটিনের গুচ্ছ শনাক্ত করেছেন। এই প্রোটিন গুচ্ছ মানব মস্তিষ্কে আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রোটিন জমার প্রক্রিয়া শুরু করে বলে তাদের ধারণা। গবেষকরা নতুন শনাক্ত করা এই প্রোটিনের গুচ্ছটির নাম দিয়েছেন ‘পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটা’। এই আবিষ্কার রোগটির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

টোকিওর ন্যাশনাল সেন্টার অব নিউরোলজি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রির (এনসিএনপি) একদল গবেষকের নেতৃত্বে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। তারা মনে করছেন, পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটা একধরনের ‘বীজ’ হিসেবে কাজ করে। এই বীজ থেকেই মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লাক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

আলঝেইমার রোগে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড বিটা নামের একটি প্রোটিনের টুকরা ধীরে ধীরে জমতে থাকে। পরে এসব প্রোটিন একসঙ্গে হয়ে গুচ্ছ বা প্লাক তৈরি করে, যা স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ধীরে ধীরে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি কমে যায়। মস্তিষ্কে এই প্রোটিন জমার প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু হয়, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ব্রেন কমিউনিকেশনস’-এ এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে গবেষকরা ইঁদুরের মস্তিষ্কে থাকা দ্রবণীয় অ্যামাইলয়েড বিটার বিভিন্ন ধরন আলাদা করেন। আকারের ভিত্তিতে তারা তিন ধরনের প্রোটিন শনাক্ত করেন।

এরপর আলঝেইমার রোগের মডেল হিসেবে তৈরি ছোট ইঁদুরের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে এসব প্রোটিনের আলাদা অংশ প্রবেশ করানো হয়। হিপোক্যাম্পাস মস্তিষ্কের স্মৃতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চার মাস পর ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখা যায়, খুব বড় আকারের অ্যামাইলয়েড বিটার গুচ্ছই শুধু নতুন করে প্রোটিন জমার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এরপর গবেষকরা মানুষের মস্তিষ্কেও একই প্রোটিনের গুচ্ছ খুঁজে দেখেন। আলঝেইমারে আক্রান্ত ছয়জন রোগীর ময়নাতদন্তে পাওয়া মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটা পাওয়া যায়।

মানুষের মস্তিষ্ক থেকে পাওয়া এই প্রোটিন পরে আলঝেইমারের মডেল ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হয়। সেখানেও অ্যামাইলয়েড বিটা জমার একই ধরনের প্রক্রিয়া দেখা যায়। এতে এই প্রোটিনের ভূমিকা নিয়ে গবেষকদের ধারণা আরও পরিষ্কার হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগবে। বর্তমানে লেকানেম্যাব ও ডোনানেম্যাবের মতো ওষুধ মস্তিষ্কে জমে থাকা অ্যামাইলয়েড বিটা সরাতে সাহায্য করে। এতে রোগের অগ্রগতি কিছুটা ধীর করা যায়।

জাপানে লেকানেম্যাব ২০২৩ সালে এবং ডোনানেম্যাব ২০২৪ সালে অনুমোদন পেয়েছে। মার্চে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, লেকানেম্যাব ও ডোনানেম্যাব নিতে আগ্রহ দেখানো ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ শতাংশেরও কম শেষ পর্যন্ত এসব ওষুধ গ্রহণ করেছেন। এর প্রধান কারণ, অনেকে এই চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ছিলেন না, আবার কেউ কেউ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ওষুধ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নতুন গবেষণার লক্ষ্য অবশ্য আরও আগের ধাপ। গবেষকেরা মনে করছেন, পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটাকে লক্ষ্য করা গেলে প্লাক তৈরি হওয়ার আগেই তা বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে। এতে আলঝেইমার প্রতিরোধেরও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া তাদাফুমি হাশিমোতো বলেন, "এ প্রোটিন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে জমাট অবস্থায় সংরক্ষিত মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষার পরই এটি শনাক্ত করা যায়। তবে ভবিষ্যতে সহজ ও শরীরের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে এ প্রোটিন শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পিইটি স্ক্যান এবং রক্তের নমুনাভিত্তিক পরীক্ষার উন্নতি হলে রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই এটি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।"

হাশিমোতোর দল এমন একটি ওষুধ তৈরির কাজও শুরু করেছে, যা মস্তিষ্কে পিক ওয়ান অ্যামাইলয়েড বিটাকে স্থিতিশীল থাকতে বাধা দেবে। সম্ভাব্য ওষুধের উপাদান বাছাই করতে এক থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। এরপর কার্যকারিতা যাচাই করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।

তারপর মানুষের ওপর পরীক্ষা শুরু হবে। সব মিলিয়ে নতুন চিকিৎসা তৈরি করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে।

জাপানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি চারজনের একজনের ডিমেনশিয়া বা হালকা স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশটিতে ডিমেনশিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগী আলঝেইমারে আক্রান্ত। তাই রোগটির শুরুতেই প্রক্রিয়াটি থামানোর নতুন উপায় খুঁজে পাওয়া দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...