পরিবেশরোহিঙ্গা সংকটের বহুমুখী প্রভাব: পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় চাপ
রোহিঙ্গা সংকটের বহুমুখী প্রভাব: পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় চাপ
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় কক্সবাজারের পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় চাপ বাড়ছে। মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্যাম্পকেন্দ্রিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চল একসময় সবুজের চাদরে আবৃত ছিল। বর্তমানে সেই পাহাড়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি গড়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল নামার প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এই দীর্ঘায়িত আশ্রয় পরিস্থিতি শুধু প্রত্যাবাসনকেই অনিশ্চিত করেনি, এটি পরিবেশের ওপরও ব্যাপক চাপ বাড়িয়েছে।
ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার, অপহরণ, মানবপাচার, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ দিন দিন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। তবে এর পুরো দায় সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর দেওয়া যায় না। ক্যাম্পে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক সাধারণ রোহিঙ্গা নিজেরাও সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক কারবারি ও অপরাধীদের ভয়ে থাকেন।
অপরাধী চক্র, সীমান্তের দুর্বলতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার সমন্বিত প্রভাবে সংকটের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে। সরকারি হিসাব ও ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার এবং ভাসানচরে প্রায় ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন।
জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি সহায়তার জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করেছে। এই অর্থ খাদ্য, আশ্রয়, পানি-স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হবে। ২০২৬ সালের এই পরিকল্পনাটি প্রায় ১৬ লাখ মানুষকে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়েছে।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে। এই অর্থ সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ‘রোহিঙ্গা খরচ’ নয়, অধিকাংশই আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাদের মাধ্যমে মানবিক সহায়তায় ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, প্রশাসন, অবকাঠামো, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপের কারণে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের পরোক্ষ অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে কক্সবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চলের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। বন অধিদফতরের নথিতে রোহিঙ্গা প্রবাহের পর বনভূমিতে মানুষের হস্তক্ষেপ ও পরিবেশগত চাপ বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। বন অধিদফতরের একটি প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা আগমনের পর টেকনাফ, হিমছড়ি, ইনানী, ফাসিয়াখালীসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর ব্যাপক মানবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এই চাপ সৃষ্টির ফলে এসব এলাকায় ৮ হাজার একরের বেশি বনভূমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আরেকটি সরকারি পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর নথিতে বলা হয়েছে, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে ক্যাম্পের আশপাশের গাছপালা ও ঝোপঝাড় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশে বনায়ন কার্যক্রম সফল করতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট বাফার জোন রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।
২০২৬ সালের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকার ভূমি ব্যবহার, উদ্ভিদ আচ্ছাদন এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে ক্যাম্প এলাকার পরিবেশগত পরিবর্তন পরীক্ষা করেছে। এদিকে ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্যও তৈরি হচ্ছে।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৪০ টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হয়। প্রায় অর্ধেক পরিবার নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে বর্জ্য পৌঁছাতে পারে। ফলে বর্ষায় ড্রেন বন্ধ হওয়া, জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজারের সদস্য সচিব এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন জানান, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে এখন পরিবেশগত সংকট হিসেবেও দেখতে হবে। তিনি আরও জানান, ক্যাম্প সম্প্রসারণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, পাহাড় কাটা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব, সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু রোহিঙ্গাদের দায়ী না করে ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয়দের অবৈধ পাহাড় কাটা, বন দখল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক প্রবেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় অপরাধী চক্রের একটি অংশ রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে। এমন অভিযোগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়মিতই সামনে আসছে।
২০২৬ সালের মে মাসে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪৩ হাজার ৬০০ ইয়াবা, একটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ২৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। জুলাই মাসে উখিয়ার পানবাজার এলাকায় ৮ এপিবিএনের অভিযানে এক রোহিঙ্গা যুবকের কাছ থেকে ছয় হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৮ এপিবিএন গত ১৪ মাসের অভিযানে প্রায় ১৬৬ জন বিভিন্ন মামলার আসামি গ্রেফতার করেছে।
একই সময়ে দুই লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধারের তথ্যও রয়েছে। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র ও অন্যান্য মাদক। অপহৃত ১৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকেও উদ্ধার করা হয়েছে। ক্যাম্পে বসবাসরত সাধারণ ও সুশীল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বললে ভিন্ন একটি বাস্তবতাও সামনে আসে। তাদের বক্তব্য, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মাদক কারবারিরা শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গাদের জন্যও বড় আতঙ্ক।
এসব রোহিঙ্গার অভিযোগ, মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অপহরণে জড়িত সশস্ত্র ব্যক্তিদের কারণে ক্যাম্পে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা চান, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মতামত (0)