সারাদেশ

সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত শুভ, কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন বাড়িতে

সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত শুভ, কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন বাড়িতে
সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত শুভ, কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন বাড়িতে
সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে লেবাননে গিয়েছিলেন সাতক্ষীরার শুভ কুমার দাস। ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার প্রায় চার মাস পর আজ রবিবার তাঁর মরদেহ কফিনবন্দী হয়ে বাড়িতে ফিরেছে।

প্রায় চার মাস পর শুভ কুমার দাসের মরদেহ তাঁর সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। কফিনবন্দী হয়ে মরদেহ পৌঁছানোর পর আজ রবিবার সকালে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শুভর বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা কফিন ধরে আহাজারি করেন। এই দৃশ্য উপস্থিত সবার মনকে ব্যথিত করে তোলে।

সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রায় তিন বছর আগে লেবাননে গিয়েছিলেন শুভ। তাঁকে বিদেশে পাঠাতে ভ্যানচালক বাবা সুরঞ্জন দাস জমি বিক্রি করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি সমিতি ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে চড়া সুদে চার লাখ টাকা ঋণ করেন। শুভ প্রতি মাসে লেবানন থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা করে দেশে পাঠাতেন।

শুভর পাঠানো টাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ভাইবোনের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত। সুরঞ্জন দাসের পরিবারে স্ত্রী শিখা রানী দাস এবং চার সন্তান রয়েছে, যার মধ্যে মেয়ে সাধনা দাস নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও ছোট ছেলে সুদীপ দাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। জমি বিক্রির পর পরিবারটি গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় মাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় বসবাস করে।

শুভর মা শিখা রানী দাস তার ছেলেকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংসারের হাল ফেরাতে গিয়ে শুভ বিয়ে না করেই লেবাননে গিয়েছিল। শিখা রানী আরও জানান, তারা ভেবেছিলেন আরও কিছুদিন থাকার পর শুভকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দেবেন। গত ১১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ইসরায়েল সীমান্তবর্তী মাইফাদুন এলাকায় কর্মস্থলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় শুভ নিহত হন।

লেবাননে শুভ একটি বাড়ি ও ফলের বাগান দেখাশোনা করতেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গত ১০ মে রাতে শুভর সর্বশেষ কথা হয়। শুভর বোন সাধনা দাস জানান, ১২ মে দুপুরে মুঠোফোনে তারা ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় শুভর মৃত্যু হয়।

ঘটনার দুই দিন পর ১৩ মে লেবাননের সেনাবাহিনী ও রেডক্রসের সহায়তায় শুভর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি নাবাতিয়ে এলাকার নাযদ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছিল। শুভর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে আবেদন করা হয়। বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাস লেবানন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

কিন্তু ঘটনাস্থলে লেবানন সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। নিরাপত্তাজনিত কারণে মরদেহ দেশে পাঠাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। পরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে শুভর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। প্রায় চার মাস পর তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়।

খুলনা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. খালেদুর রহমান জানান, শুভর পরিবার বিমানবন্দর থেকে ইতিমধ্যে ৮৫ হাজার টাকা পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, শুভ যদি বৈধ পথে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারির পর বিদেশে গিয়ে থাকেন, তাহলে মোট ১৩ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা পাবেন। তবে ২০২৩ সালের আগে বিদেশ গিয়ে থাকলে সহায়তার পরিমাণ হবে ৩ লাখ টাকা।

এই সহায়তা পেতে শুভর বিএমইটি নিবন্ধন ও বিদেশ যাওয়ার তথ্য যাচাই করা হবে। কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শুভ যে এলাকায় মারা গেছেন, সেটি ইসরায়েল সীমান্তের খুব কাছে। সেখানে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে দেরি হয়।

ইউএনও আরিফুল ইসলাম আরও জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মরদেহ দেশে পাঠাতেও সময় লেগেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করলে পরিবার সরকারি সহায়তা পাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব, তা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...