জাতীয়শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তার প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারত জানিয়েছে, এটি একটি আইনি বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার ফলে তার দেশে ফেরা আইনি ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক শেখ হাসিনা গত ১০ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শেখ হাসিনা এটিকে ‘দেশে ফেরা’ এবং ‘ফিরে আত্মসমর্পণ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আইনি ও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। গত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ থেকে পলায়নের পর তিনি ভারতের আশ্রয়ে আছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দী বিনিময় ও প্রত্যর্পণ চুক্তি বিদ্যমান থাকায়, তার বাংলাদেশে ‘আসার’ বিষয়টি ওই আইনের আওতায়ই নিরূপিত হওয়ার কথা।
শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন। তিনি আপিল করেননি এবং তাকে কোনো জামিনও দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে তাকে দেশের ভেতরে পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধ্যবাধকতা হলো তাকে আটক করা।
আইনি দিকটি ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সাল থেকেই একাধিকবার হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরকার এই মর্মে একটি নোট ভার্বালও পাঠায়। ভারত সেই নোট ভার্বালের প্রাপ্তি স্বীকার করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবেই ভারতকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। ট্রাইব্যুনালের রায় প্রকাশের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে এই রায় তাদের নজরে আছে। ওই বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে স্থাপন করে ভারত তাদের অবস্থানের একটি ইঙ্গিত দিয়েছিল।
নতুন সরকার গঠনের পর এই বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিল্লি সফরে গেলে তিনি ভারত সরকারের কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। তারই প্রেক্ষাপটে গত ১৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশের অনুরোধটি ‘চলমান বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।’
সম্প্রতি শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও জয়সোয়াল বলেছেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে বলেন, যেকোনো প্রত্যর্পণই আইনি বিষয় এবং আইনি প্রক্রিয়াতেই এর নিষ্পত্তি হবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা কী করবেন, সেটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়।
ভারত একাধিকবার বলেছে, ‘একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে “সাময়িক” (ফর দ্য টাইম বিয়িং) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।’ ফলে শেখ হাসিনা একাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, এমন মনে করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশ এবং ভারত দুই পক্ষই এই বিষয়ে একমত যে এই বিষয়ে আইনই প্রাধান্য পাবে।
সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন। এই চুক্তির অধীন প্রত্যর্পণের জন্য ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে এবং মোটাদাগে ছয়টি ধাপ আছে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অনুরোধকারী রাষ্ট্র কর্তৃক এই বিষয়টি প্রমাণের মাধ্যমে যে সংঘটিত অপরাধটি চুক্তির অধীন একটি ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ’।
চুক্তির অনুচ্ছেদ ২(১) অনুযায়ী, অপরাধটিকে অবশ্যই ‘দ্বৈত অপরাধযোগ্যতা’ নীতি পূরণ করতে হবে। এর অর্থ হলো যে অপরাধমূলক আচরণের কারণে প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তা বাংলাদেশ এবং ভারত—উভয় দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হতে হবে। উভয় দেশের বিচারব্যবস্থায় এর জন্য কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকতে হবে। আইনি পরিভাষা বা সংবিধিবদ্ধ শ্রেণিবিন্যাসের ভিন্নতা প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না বলে অনুচ্ছেদ ২(৩)-এ উল্লেখ করা হয়েছে।
যে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পূর্বেই দণ্ডিত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাছে একটি উপযুক্ত আদালত কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ সাজার রায় ও দোষী সাব্যস্তকরণের প্রমাণ থাকতে হবে।
মতামত (0)