সারাদেশশেরপুরের জামুর ঢিবি: প্রাচীন রহস্যের সন্ধানে
শেরপুরের জামুর ঢিবি: প্রাচীন রহস্যের সন্ধানে
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের আদম জামুর গ্রামে অবস্থিত 'জামুর ঢিবি' স্থানীয়ভাবে 'ধনপোতা ঢিবি' নামেও পরিচিত। এর নিচে রাজবাড়ি বা প্রাচীন জনপদের চিহ্ন থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের আদম জামুর গ্রামে একটি বিশাল ঢিবি স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঢিবিটি ‘জামুর ঢিবি’ নামে পরিচিত হলেও এটিকে ‘ধনপোতা ঢিবি’ নামেও ডাকা হয়। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, এর নিচে রাজবাড়ি, প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা অথবা কোনো প্রাচীন জনপদের চিহ্ন চাপা পড়ে আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই রহস্যের উত্তর মিলতে পারে।
গত আগস্ট মাসের একত্রিশ তারিখে সবুজ ফসলের মাঠের মাঝে এই ঢিবিটি পরিদর্শন করা হয়। এটি খেজুর, বরই, পিতরাজসহ নানা গাছে ঘেরা এবং কোথাও লজ্জাবতী ফুল ফুটে আছে। এর চারপাশে নিরিবিলি গ্রামীণ পরিবেশ বিরাজ করছে।
শেরপুর উপজেলা শহর থেকে ঢিবির দূরত্ব প্রায় নয় কিলোমিটার। শেরপুর-নন্দীগ্রাম আঞ্চলিক সড়কের নন্দীগ্রাম সড়ক মোড় অথবা কলেজ রোড থেকে কুসুম্বি ইউনিয়নের বেলঘড়িয়া বাজারে গিয়ে সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আদম জামুর গ্রামের পাশে এই ঢিবিটি অবস্থিত। গ্রামের পাকা সড়ক থেকেই এটি দেখা যায়।
সমতল জমির তুলনায় ঢিবিটি বেশ উঁচু। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি আগে অনেক উঁচু ছিল এবং ধীরে ধীরে মাটিতে দেবে গেছে। তাঁদের হিসাবে, বর্তমানে এর উচ্চতা প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ ফুট এবং আয়তন প্রায় দুই থেকে আড়াই একর।
ঢিবির ওপর ও চারপাশে নানা ধরনের গাছপালা রয়েছে, যা দূর থেকে সবুজে ঘেরা ঢিবিটিকে আলাদা করে তোলে। তবে এই সবুজের আড়ালেই ক্ষয়ের চিহ্ন বিদ্যমান। ঢিবির নিচের অংশের মাটি কেটে আশপাশের জমি চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে এবং ওপরের অংশেও মাটি কাটার দাগ রয়েছে।
কাটা মাটিতে পুরোনো ইট ও মাটির তৈজসপত্রের টুকরাও দেখা যায়। পঁচাত্তর বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ আলী প্রামাণিক ছোটবেলায় ঢিবিটিকে এখনকার তুলনায় অনেক উঁচু দেখেছিলেন। তাঁর বাবা-দাদারাও এই ঢিবির কথা জানতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মমতাজ আলী বলেন, সময়ের সঙ্গে ঢিবিটি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে যাচ্ছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষ ঢিবির মাটি কেটে পুরোনো ইটের টুকরা সংগ্রহ করতেন এবং বাড়িঘরের বিভিন্ন কাজে সেসব ইট ব্যবহার করতেন। ঢিবির চারপাশে সমতলজুড়ে ফসলি জমি রয়েছে।
জামুর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম মনে করেন, স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এসব গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের কিছু সূত্রও মেলে। তিনি জানান, বগুড়া অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এ অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জনপদ ও স্থাপনার বিকাশ ঘটেছে। এতে জামুর ঢিবিকে ঘিরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
কুসুম্বি ইউনিয়নের জামুর ইসলামিয়া কলেজের ইসলামের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক মো. সুজাউদ্দৌলা প্রচলিত ধারণাগুলো যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে ঢিবিটির ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
কুসুম্বি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম ঢিবিটি খনন ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান জামুর ঢিবি পরিদর্শন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, এত বড় ঢিবি সাধারণত দেখা যায় না। উত্তরবঙ্গে একশ একষট্টিটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষিত আছে, যার মধ্যে জামুর ঢিবিও রয়েছে।
ঢিবিটি ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, সুনির্দিষ্ট সময় বলতে না পারলেও এটি খননের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে। জামুর ঢিবিতে নিয়মিত দর্শনার্থীর আনাগোনা তেমন নেই। দিনের বেশিরভাগ সময় ঢিবিটি শান্ত পড়ে থাকে। মাটির স্তর সরালে এই ঢিবিই হয়তো অজানা কোনো ইতিহাস সামনে আনতে পারে, যা শেরপুরের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে।
মতামত (0)