শিক্ষা

শিক্ষায় বৈষম্য ও ব্যয় বৃদ্ধি, কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা

শিক্ষায় বৈষম্য ও ব্যয় বৃদ্ধি, কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা
শিক্ষায় বৈষম্য ও ব্যয় বৃদ্ধি, কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা
শিক্ষা দিবসের ৬৪ বছর পরও শিক্ষায় বৈষম্য বেড়েই চলছে। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও শিক্ষার্থীদের কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে শিক্ষাব্যয় বাড়ছে।

আজ ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন শরিফ শিক্ষা কমিশনের প্রতিবাদে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করা। ৬৪ বছর পরও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, বরং শিক্ষায় নতুন ধরনের বৈষম্য যুক্ত হয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। শিক্ষানীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারত এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথও প্রশস্ত হতো।

প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক হলেও অনেক শিক্ষার্থীকে শেখার ঘাটতি পূরণে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাটি বাস্তবে হোঁচট খাচ্ছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অধিকাংশ শিশুর শিক্ষার প্রধান ভরসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এইসব বিদ্যালয়ে টিউশন ফি না থাকলেও শিক্ষকসংকট, শিক্ষার মান ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে দেখা যায়, অনেক শিশু বাংলা বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না এবং ইংরেজি ও গণিতে তাদের দুর্বলতা রয়েছে।

অন্যদিকে, সচ্ছল পরিবারের শিশুরা কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। কাগজে-কলমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক হলেও এই সুবিধা মূলত সরকারি বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ।

কিন্ডারগার্টেনে টিউশন ফি কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই উচ্চ আয়ের পরিবারের সন্তান। এর বাইরে কওমি মাদ্রাসায়ও বিপুলসংখ্যক শিশু পড়ে।

বর্তমানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৬ শতাংশের বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকার ঝরে পড়া কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াও চলছে বলে তিনি জানান।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২৮। তবে শহর এলাকার তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট বেশি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি এখনো শূন্য রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানানো যাবে। নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়। একসঙ্গে অনেক সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতি হলে নতুন সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেছেন, শিক্ষার মান উন্নত করতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও তাঁদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে দেশে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সরকারের সময় আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে।

বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষানীতি করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক মাত্রায় পরিমার্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও কিছু পরিমার্জন এবং চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বই যুক্ত করা হবে।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই আয়, অবস্থান ও সুযোগের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও গবেষণার সুযোগ সীমিত, আবার কোথাও শিক্ষার্থীরা কোচিংনির্ভর। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে তার জন্মস্থান, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, এসবের ওপর।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করা হয়েছে। শিক্ষাবিদদের বড় অংশের মতে, এতে শিক্ষার সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য বাড়তে পারে। তাঁরা যুক্তি দেন, বৃত্তির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। এতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা নিয়েও একই প্রশ্ন রয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...