স্বাস্থ্য

শর্করাপ্রীতির নেপথ্যে বিজ্ঞান ও বিবর্তন: কেন ভাত ছাড়তে পারি না

শর্করাপ্রীতির নেপথ্যে বিজ্ঞান ও বিবর্তন: কেন ভাত ছাড়তে পারি না
শর্করাপ্রীতির নেপথ্যে বিজ্ঞান ও বিবর্তন: কেন ভাত ছাড়তে পারি না
কার্বোহাইড্রেটের প্রতি মানুষের অদম্য টান কেবল খাদ্যাভ্যাস নয়, এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনীয় কারণ। মস্তিষ্ককে প্রফুল্ল রাখতে ও শক্তি যোগাতে শর্করা অপরিহার্য।

কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন মানুষকে মানসিকভাবে প্রফুল্ল ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে সহায়তা করে। সারাদিন কাজ শেষে এক থালা গরম ভাত থেকে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, তার পেছনে মূলত এই রসায়নের অবদান রয়েছে।

ধোঁয়া-ওঠা এক থালা গরম ভাত, ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া একটুখানি ঘি, সঙ্গে একটু ডাল আর ভর্তা বাঙালির কাছে অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দিতে এই এক থালা ভাতই যথেষ্ট। ভাতের ঘ্রাণ পেলেই মন ও মস্তিষ্ক আপনাআপনি শান্ত হয়ে আসে।

খাদ্যাভ্যাস থেকে কার্বোহাইড্রেট সম্পূর্ণ বাদ দিলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের ঘাটতি দেখা দেয়। এটি মানুষকে বিষণ্ণ ও অস্থির করে তোলে। আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বা ‘ডায়েট’-এর নামে অনেকে খাদ্য তালিকা থেকে ভাত বা রুটিকে বাদ দিচ্ছেন।

তাদের ধারণা, ওজন কমানো বা ফিট থাকার পথে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাই প্রধান শত্রু। কিন্তু কয়েক দিন ভাত না খেলেই মাথা ঘোরে, কাজের গতি কমে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করে। ভাত, রুটি বা শর্করার প্রতি এই অদম্য টান কেবল দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস নয়।

এর পেছনে বিজ্ঞান ও বিবর্তনীয় ইতিহাস রয়েছে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, ভাতের প্রতি এই দুর্বলতা মানুষের রক্তে মিশে আছে। বিশ্বখ্যাত একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষ কৃষিকাজ শেখার অনেক আগেই শ্বেতসার বা স্টার্চ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল।

মানুষের লালাগ্রন্তিতে ‘এএমওয়াই১’ নামের একটি জিন থাকে। এটি শ্বেতসার হজমকারী এনজাইম বা ‘অ্যামাইলেজ’ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় আট লাখ বছর আগে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ-তে এই জিনের ডুপ্লিকেট বা অনুলিপি তৈরি হওয়া শুরু হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পূর্বপুরুষদের শরীরে এই জিনের অনুলিপি যত বেশি ছিল, তারা তত সহজে শর্করা জাতীয় খাবার হজম করে দ্রুত শক্তি তৈরি করতে পারতেন। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার রসদ যোগাড় করতেন ভাত থেকে। যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তাদের সেই গুণই মানুষের শরীরে চলে এসেছে।

তাই ভাত বা রুটির প্রতি দুর্বলতা কেবল লোভ বা বাজে অভ্যাস নয়। এটি মূলত লক্ষ বছর ধরে মানুষের শরীরে বয়ে চলা বেঁচে থাকার এক বৈজ্ঞানিক সংকেত। যুক্তরাষ্ট্রের পুষ্টিবিদ তেরেসা ইউরি কার্বোহাইড্রেটকে গাড়ির ইঞ্জিনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

জ্বালানি ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও মানুষের শরীর অলস হয়ে পড়ে। কার্বোহাইড্রেট ভেঙে শরীর ‘গ্লুকোজ’ তৈরি করে, যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান ও সবচেয়ে পছন্দের খাবার। তাই হঠাৎ ভাত বা রুটি খাওয়া বন্ধ করে দিলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত জ্বালানি পায় না।

এর ফলে মাথা ঘোরা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কাজের গতি কমে যাওয়া এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি গ্রাস করে। তবে ইচ্ছেমতো ভাত-রুটি বা মিষ্টি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিজ্ঞান বলছে, কার্বোহাইড্রেটের ধরন বুঝে খাওয়াটাই আসল সচেতনতা।

চিনি, কোল্ড ড্রিংকস, কেক, প্যাকেটজাত চিপস এবং অতিরিক্ত পলিশ করা সাদা চাল পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট। এগুলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেয়, দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর দ্বিগুণ খিদে ও ওজন বাড়ায়।

অন্যদিকে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস, মিষ্টি আলু, ডাল ও বিভিন্ন শাকসবজিকে জটিল কার্বোহাইড্রেট বলা হয়। এই খাবারগুলো ধীরে হজম হয়। এগুলো রক্তে গ্লুকোজের সামঞ্জস্য বজায় রাখে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে শক্তি জোগায়।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, ফিট থাকতে ভাত বা শর্করা বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক পরিমাণে সঠিক শর্করা নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাদের পরামর্শ হলো, ভাত পুরোপুরি না ছেড়ে ভাত খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমানো যেতে পারে।

সম্ভব হলে পরিশোধিত চালের বদলে লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি খাওয়া শুরু করা উচিত। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে, যা হজম ধীর করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। দুপুর বা রাতের খাবারের প্লেটের অর্ধেক অংশ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও সালাদ রাখতে হবে।

এক-চতুর্থাংশ অংশ পূরণ করতে হবে মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল (প্রোটিন) দিয়ে। বাকি এক-চতুর্থাংশ অংশে ভাত বা রুটি রাখা যেতে পারে। শুধু ভাত বা শুধু শর্করাজাতীয় খাবার না খেয়ে তার সাথে ভালো প্রোটিন এবং অল্প পরিমাণে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যেমন বাদাম, খাঁটি সরিষার তেল বা অলিভ অয়েল যোগ করা যেতে পারে। এতে পাকস্থলীতে খাবার অনেকক্ষণ থাকে এবং বারবার খিদে পাওয়ার প্রবণতা কমে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...