জাতীয়সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলায় তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কে নতুন মাত্রা
সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলায় তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কে নতুন মাত্রা
সিরিয়ার আবু আল-দুহু বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে ইসরায়েলের দাবির ভিত্তি মেলেনি।
উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহু বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দেশগুলো তীব্র নিন্দা জানায়। ইসরায়েলি সরকার দাবি করে, তাদের কাছে ওই স্থানে তুর্কি সামরিক উপস্থিতির গোয়েন্দা তথ্য ছিল।
তবে সিরিয়া-বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত ও তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে জানান, হামলার ছয় দিন আগেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা নিজস্ব অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েলের এই দাবির কোনো ভিত্তি খুঁজে পায়নি। এই ঘটনা তুরস্ক ও ইসরায়েলের পরিবর্তিত সম্পর্কের সমীকরণকে স্পষ্ট করেছে।
আঙ্কারা সিরিয়ার ঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলাকে উসকানিমূলক মনে করলেও পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়নি। বরং তুরস্ক সংকট সমাধানের একটি পথ বের করে দিয়েছে। আঙ্কারা বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হিসেবে না দেখে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাধারণত তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাত এড়ানোর একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া চালু থাকে। কিন্তু টম বারাক তার সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েল হামলার বিষয়ে তুরস্ককে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। এমন পদক্ষেপ একটি সরাসরি সামরিক জবাবকে উসকে দিতে পারত।
মার্কিন দূত একটি নতুন সামরিক সমন্বয় ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এমন উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো শান্তি বজায় রাখতে চায়। এই ক্ষেত্রে ইসরায়েল যে উত্তেজনা কমাতে চেয়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। বস্তুত উত্তেজনা সৃষ্টি করাই হয়তো তাদের লক্ষ্য ছিল।
কারণ, তারা তুরস্ক বা যুক্তরাষ্ট্র কাউকেই এই হামলার ব্যাপারে অবহিত করেনি। তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি অজুহাত ব্যবহার করেছে। এটি দৃশ্যত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় সুবিধা নেওয়ার একটি কৌশল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান ইস্যুতে মার্কিন হস্তক্ষেপে কিছুটা বিরতি আসার পর নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনের আগে সিরিয়া, লেবানন কিংবা গাজায় নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি করতে চাইছেন। এখন তুরস্কের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেতানিয়াহুর এই ফাঁদে পা না দেওয়া। একই সঙ্গে এমন আগ্রাসনকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে না নেওয়া।
এর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এতে নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তুরস্ক, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় ব্যবস্থা তখনই কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে তাদের পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করে।
তবে কোনো ব্যবস্থা চালু হলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে সিরিয়া পরিস্থিতি তুরস্ক ও ইসরায়েলের একে অপরকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রতি তুরস্কের অসন্তোষের মূল কারণ ছিল ফিলিস্তিন সংকট। ফলে তা ছিল অনেকটাই মানবতাবাদী ও আদর্শিক সংহতিভিত্তিক।
কিন্তু আঙ্কারা এখন মনে করে, সিরিয়ার বর্তমান রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করার ইসরায়েলি চেষ্টা সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই আঙ্কারা এখন আর ইসরায়েলকে শুধু ফিলিস্তিন প্রশ্নের আলোকে দেখছে না। বরং ইসরায়েলের এই আঞ্চলিক আগ্রাসনকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করছে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের নীতি, অগ্রাধিকার ও নিরাপত্তা ভাবনায় স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সিরিয়া পরিস্থিতি এই দুই দেশের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে। আঙ্কারা চায় তার দক্ষিণ প্রতিবেশী সিরিয়া হোক একটি কেন্দ্রশাসিত, স্থিতিশীল এবং সামরিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্র।
এর বিপরীতে, ইসরায়েল চায় একটি দুর্বল, খণ্ড-বিখণ্ড এবং সামরিক শক্তিশূন্য সিরিয়া। তবে এটি কেবল তুর্কি ও ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েল মূলত সিরিয়া নিয়ে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের বিপরীতে অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এখন দামেস্কে একটি স্থিতিশীল ও কেন্দ্রশাসিত সরকারের সমর্থক। এই অঞ্চলে ইসরায়েল ছাড়া কেবল ইরানই হয়তো একটি দুর্বল বা ব্যর্থ সিরিয়া দেখতে চায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মতামত (0)