জাতীয়সংসদ সদস্যের বহিষ্কার ও স্পিকারের এখতিয়ার
সংসদ সদস্যের বহিষ্কার ও স্পিকারের এখতিয়ার
দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে স্পিকারের দপ্তরে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সুজন এই বিষয়ে স্পিকারের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী বহিষ্কার করেছে। দল তাঁর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্পিকারের দপ্তরে একটি আবেদন পাঠিয়েছে। এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক এই প্রসঙ্গে বলেছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যদের পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। অতীতে স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবু হেনার সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেননি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করেছিলেন। তবে কমিশন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই জনাব সিদ্দিকী পদত্যাগ করেন।
সুজন মনে করে, জনাব ইসলামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার স্পিকারের এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সংসদ ও সংসদীয় ‘বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র। বিদ্যমান সংবিধানে দুটি স্থায়ী কমিটির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো সরকারি হিসাবসম্পর্কিত কমিটি এবং অন্যটি সংসদীয় বিশেষ অধিকার কমিটি। এই দুটি কমিটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় বিশেষ অধিকার কমিটি স্পিকারের নেতৃত্বে ১০ সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মো. নুরুল ইসলাম, জয়নুল আবদিন ফারুক ও নাহিদ ইসলাম। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ সংসদীয় বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি–সম্পর্কিত। এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলি অনুযায়ী সংসদ তার কার্যপ্রণালি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত।
সংসদ সদস্যদের বাক্স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ এবং এটিও আদালতের এখতিয়ারের বাইরে। এসব বিষয়ে সুরক্ষা প্রদানের জন্য ৭৮(৫) অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত এই আইন কার্যকর হয়নি। সংবিধানের ৭৬(২)(গ)(ঘ) ও ৭৬(৩) অনুচ্ছেদও সংসদীয় বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত।
সংসদীয় বিশেষ অধিকারের ধারণা এসেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে। সংসদীয় বিষয়ে পণ্ডিত এরেসকাইন মে তাঁর বিখ্যাত ট্রিটাইজ অন দ্য ল, প্রিভিলেজেস, প্রসিডিংস অ্যান্ড ইউসেজ অব পার্লামেন্ট গ্রন্থে এই বিষয়ে লিখেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বতন্ত্র অধিকারের সমষ্টি, যা প্রত্যেক সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় কক্ষই উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার। এই অধিকারগুলো ছাড়া সংসদ ও সংসদ সদস্যরা তাঁদের দায়িত্ব পালনে অক্ষম।
বিশেষ অধিকারগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: কতগুলো এককভাবে সংসদের জন্য প্রযোজ্য এবং অন্যগুলো পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তি সংসদের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ক্ষেত্রগুলো হলো বাক্স্বাধীনতা, দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার থেকে অব্যাহতি এবং সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি। এগুলো মূলত দায়মুক্তি–সম্পর্কিত অধিকার এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ১৭২-১৭৬ ধারায় এসব সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলোর মধ্যে রয়েছে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে, এমনকি সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার বা সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান, দুর্নীতি, অপকর্ম ও অসদাচরণের জন্য সংসদ সদস্যদের বহিষ্কার এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সংসদের এ ধরনের অধিকারকে শাস্তিমূলক ক্ষমতা বলা হয়।
এছাড়াও সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা বা কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণসম্পর্কিত ক্ষমতা এবং সংসদের উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সুজন আশা করে, স্পিকার তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে অবিলম্বে জনাব ইসলামের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন। প্রয়োজনে তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করা হবে, যা সংসদের অন্যান্য সদস্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
মতামত (0)