আন্তর্জাতিকসৌদি আরবের আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া
সৌদি আরবের আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া
এত দিন এড়িয়ে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করেও এখন কেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরব | প্রথম আলো
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০২: ০০
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
চলমান আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে বিগত পাঁচ মাস ধরে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। এমনকি ইরানি ড্রোন দেশটির তেলশিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করার পর
গত পাঁচ মাস ধরে সৌদি আরব চলমান আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করে আসছিল। এমনকি ইরানি ড্রোন তাদের তেলশিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করার পরও রিয়াদ তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল।
তবে সৌদি আরব এখন নিজেদের কোণঠাসা অবস্থায় দেখছে। তাদের তিন দিক থেকেই শত্রুতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে—ইরান এবং ইরাক ও ইয়েমেনে ইরানের অনুগত গোষ্ঠীগুলো।
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের দিক থেকে নতুন কিছু হুমকির মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ভোরের দিকে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয় যে, সৌদি আরবের জন্য আর সংযম দেখানোর সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব যুদ্ধবিমানগুলো পূর্ব ইরাকে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। বড় পরিসরে একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রিয়াদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং উচ্চ মূল্য দিতে হতে পারে।
এক দশক ধরে সৌদি আরব বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দেশের দরজা খুলে দেওয়া এবং নিজেদের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নীতি গ্রহণ করেছিল রিয়াদ।
এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নীতি নেওয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিও সম্পন্ন হয়।
সৌদি আরব একটি ঝড়ের কেন্দ্রে পড়ে যাওয়ায় তাদের সেই কৌশলটি এখন চরম সংকটে পড়েছে। তিন দিক থেকে অননুমেয় এবং অপ্রথাগত যুদ্ধে পারদর্শী শত্রুদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাকারীর জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন।
সৌদি আরব নিজেদের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন করতে এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনতে শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে। কিন্তু দেশটির ভূখণ্ড বিশাল, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
পাশাপাশি সৌদি আরবের দীর্ঘ উপকূল এবং বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তেল অবকাঠামোগুলোও রয়েছে। এগুলি দেশের সুরক্ষায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
গত শনিবার লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতিরা। স্যাটেলাইট ছবি ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান থেকে জানা যায়, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জাজানে অবস্থিত একটি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতিরা। এর আগে তারা বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজের চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল। গত সোমবার অন্য একটি সৌদি জাহাজেও হামলার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় সৌদি আরব ইয়ানবুর মতো লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর মাধ্যমে তাদের তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ আবারও সচল করেছিল। ফলে হুতিদের এই অবরোধকে বড় ধরনের উসকানি হিসেবে দেখছে রিয়াদ।
আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়ে দিনে প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এশিয়ার বাজারের উদ্দেশে ইয়ানবু ছেড়ে যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলোকে বাব আল–মানদেব প্রণালি অতিক্রম করতেই হবে।
ফলে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করা তেলের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই হুতিদের বাধার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল থেকে হুতিদের উচ্ছেদ করতে টানা সাত বছর চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় সৌদি আরব। যে উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালে তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা সফল হয়নি। পরবর্তী সময়ে এই সংঘাত বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়।
২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ শান্তিতে রূপ নেয়নি। হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক ও আকাশপথে অবরোধ বজায় রেখেছে সৌদি আরব।
ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি আরব বোমাবর্ষণ করেছে বলে চলতি মাসের শুরুর দিকে হুতিরা অভিযোগ করে। তেহরান থেকে আসা একটি সরাসরি ফ্লাইটের অবতরণ ঠেকাতে এই হামলা চালানো হয়েছিল। এর আগে উড়োজাহাজটিকে গতিপথ পরিবর্তনের নির্দেশনা দিলেও সেটি তা উপেক্ষা করেছে।
ওই ফ্লাইটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য থেকে ফিরে আসা একটি হুতি প্রতিনিধিদল ছিল। লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের নাওয়াফ ওবেইদ বলেন, ‘এ ছাড়া উড়োজাহাজটিতে করে আর কী কী পরিবহন করা হয়ে থাকতে পারে, সেদিকেও নজর ছিল।’
এ ঘটনাই নতুন করে সংঘাতের জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় শনিবারের ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। মধ্যপ্রাচ্য–বিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল বাশা বলেন, ‘সব সীমা (রেডলাইন) অতিক্রম করা হয়েছে এবং হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের সব ধরনের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।’
মতামত (0)