রাজনীতি

সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে এনসিপির ব্যর্থতার খতিয়ান

সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে এনসিপির ব্যর্থতার খতিয়ান
সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে এনসিপির ব্যর্থতার খতিয়ান
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে বলেছে, সরকার তিনটি অগ্রাধিকারের প্রতিটিতেই ব্যর্থ হয়েছে। তারা জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ছয় মাস পর তথ্য-উপাত্ত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা গেছে, সরকার তিনটি অগ্রাধিকারের প্রতিটিতেই নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। এই সম্মেলনে ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন-অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা’ নামের একটি পুস্তিকা পড়ে শোনানো হয়।

নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সংস্কারগুলো একে একে বাতিল করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন এবং সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকার্যকর আইনে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বহুল প্রচারিত ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে নির্লজ্জ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকার নির্ধারিত অগ্রাধিকার পলিসিতে বিচার এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অনুপস্থিত। বিরোধী দল-মত ও সাংবাদিকদের ওপর সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের হামলা-মামলার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সিংহভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের পরিবর্তে হামলায় আহতদের আইনিভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশকে ফের দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হচ্ছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই সনদ ভঙ্গ করেছে।

বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশের পাম্পগুলোতে ভয়াবহ পেট্রোল ও ডিজেল সংকট দেখা দেয়। পাম্পগুলোর সামনে গণপরিবহণ, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এক লিটার তেলের জন্য অনেককে টানা ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সংকটের মধ্যেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়ায়।

প্রতি লিটারে ডিজেলে ১৫ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, এই সংকটের পেছনে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের ভূমিকা দেখা গেছে। পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে তেল মজুদ রাখার ঘটনা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক অভিযানে উঠে এসেছে।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। গত দেড় মাস ধরে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট। ঢাকার মতো শহরে দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা চুলা জ্বলছে না, আর লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে শিল্পকারখানায় এত দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহে এমন সংকট বিরল।

গৃহস্থালিতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে রান্না করতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নির্দিষ্ট কিছু কারাখানায় উৎপাদন ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কাচ, ইস্পাত, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সিরামিক ও বেকারি শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে গ্যাসের চাপ কোথাও শূন্যে নেমে গেছে।

এই জুলাইযুদ্ধের আহ্বায়ক বলেন, বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড হয়েছে। গ্রাম ও মফস্বলে দিনে ১০ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লসের দায় গ্রাহকদের ওপর চাপানো হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের দুর্বল মনিটরিং ও রাজনৈতিক-সমর্থনপুষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের প্রতি বস্তা সারে অতিরিক্ত ৩৫০-৪৫০ টাকা গুনতে হচ্ছে। জ্বালানি পাম্পের মতোই এখন সারের দোকানেও দীর্ঘ সারি। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকরা অসাধু ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পাহাড়সম আকার নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফোনকলে ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের রদবদল হচ্ছে। একদিকে, এস আলমের মতো ব্যাংক লুটেরাদের এবং লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনার দৃশ্যমান কার্যক্রম নাই। অন্যদিকে, খেলাপী ঋণকে পুনঃতফসিলীকরণের হিড়িক পড়েছে। ইধহশ জবংড়ষঁঃরড়হ অপঃ, ২০২৬-এর ১৮ক ধারার মাধ্যমে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ অলিগার্কদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...