উপকূলীয় বাংলাদেশের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন আগামী ১০ বছরে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একটি গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এই তথ্য উঠে এসেছে।
উপকূলীয় বাংলাদেশের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার (সিভিডি) রোগ, অর্থাৎ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এই তথ্য উঠে এসেছে। আগামী ১০ বছরে অন্তত ১০ শতাংশ বা তার বেশি মাত্রার ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে।
‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক একটি সেমিনারে এই গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ এই কর্মসূচির বাংলাদেশ অংশের প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরেন।
গবেষণায় উপকূলের খাবার পানির উৎসে ব্যাপক লবণাক্ততার চিত্রও পাওয়া গেছে। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের ওপর খাবার পানির জরিপটি চালানো হয়।
এতে ২ উপজেলার ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করা হয়। এসব উৎসের মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দেখা গেছে।
খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া যায়। কয়রায় খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততার হার আশাশুনির তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
গবেষণার আরেকটি অংশে এই দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যক্তির আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগ কিংবা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কয়রা উপজেলায় এই হার ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গবেষকেরা এই তথ্যকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
গবেষকেরা উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হৃদ্রোগের ঝুঁকির উচ্চ হার—দুটি বিষয়ই গবেষণায় তুলে ধরেছেন। পানির সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা জানান।
গবেষণাটি ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এটি শেষ হবে বলে আলিয়া নাহিদ জানিয়েছেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারিত হয়নি। তিনি পানিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা করে উপযুক্ত স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
একই কলেজের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময় লবণাক্ত থাকতে পারে। তিনি দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করার এবং উপকূলীয় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী তা উঁচু করার জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেন।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ এখনো সীমিত। তিনি বলেন, আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে এবং উপকূলে স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি ফিল্টার (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার), টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খাবার পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন ও নজরদারিব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।
পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে।
মতামত (0)