আন্তর্জাতিকআইএমএফের সতর্কবার্তা: বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়ানোর শঙ্কা
আইএমএফের সতর্কবার্তা: বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়ানোর শঙ্কা
আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিভিন্ন দেশের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। সংস্থাটি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা থেকে এই সতর্কতা দিয়েছে। গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত এই সভার এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের ‘গ্লোবাল পলিসি এজেন্ডা’ তুলে ধরার সময় এসব তথ্য জানানো হয়।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও ভালোভাবে বিভিন্ন ধাক্কা সামলে উঠেছে। তবে বারবার ঘটে যাওয়া নানা বিঘ্ন বিভিন্ন দেশের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা গত বছরের ৩ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় কম।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের নীতিগত সুরক্ষা সক্ষমতা বা ‘বাফার’ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সরকারি বন্ডের ইল্ড (আয়) বেড়ে যাওয়ায় উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের উচ্চ ব্যয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফের ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে তা জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ বৃদ্ধি এ পরিস্থিতির অন্যতম চালক।
সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা, কৌশলগত স্বনির্ভরতা এবং অন্যান্য সরকারি খাতে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ায় সরকারের হাতে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সরকারি অর্থব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জ্বালানির উচ্চ মূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করলে সুদহারও দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে।
আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়লেও অনেক দেশে তার যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। ঋণের উচ্চ মাত্রা, বাড়তি সুদহার এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তিনি আরও বলেন, ছয় মাস আগের প্রত্যাশার তুলনায় চলতি বছরের আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে এবং এক বছর আগের তুলনায়ও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য উত্তেজনা এবং খাদ্যবাজারে ‘এল নিনো’র সম্ভাব্য প্রভাব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-কে কেন্দ্র করে বাজারে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংশোধন (market correction), অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং সাইবার হুমকিও ঝুঁকির কারণ।
বর্তমানে দুটি বিপরীতমুখী শক্তি কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে এবং পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করে তুলছে।
জ্বালানি খাতের ধাক্কাটি যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা ক্ষতিকর হয়নি। এর কারণ হলো—সরবরাহ ব্যবস্থায় নমনীয়তা, মজুত পণ্য ব্যবহার, তেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং সরকারি আর্থিক সহায়তা। আইএমএফের মতে, আপাতত অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো সম্ভব হয়েছে, তবে প্রবৃদ্ধির হার এখনো ধীর এবং মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে।
জর্জিয়েভা জানান, স্বল্প আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগের রাজস্বের ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর অর্থ সরকারগুলোকে সংগৃহীত রাজস্বের আরও বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে, ফলে দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, উন্নত অর্থনীতিগুলোর সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও পড়ছে।
জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ যারা সরাসরি সংঘাতের শিকার নয়, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো যেসব অর্থনীতি প্রযুক্তিগত মূল্য শৃঙ্খলের (ভ্যালু চেইন) সঙ্গে যুক্ত, এবং যেসব দেশের কৌশলগত মজুত রয়েছে—তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। অন্যদিকে, জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, যাদের নীতিগত সুরক্ষা বা ‘বাফার’ সীমিত এবং যারা প্রযুক্তি খাতের এই উল্লম্ফন থেকে দূরে রয়েছে, তারা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। স্বল্প আয়ের ও ভঙ্গুর অর্থনীতির অনেক দেশ এই দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভুক্ত।
জর্জিভা উল্লেখ করেন যে, সাইবার হুমকি ইতিমধ্যেই বাস্তব জীবনে ক্ষতি করছে। তিনি ফ্রান্সের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন, যেখানে সাইবার হামলার কারণে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে খাবার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের হামলা ঘন ঘন হতে থাকলে তা আর্থিক ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যার ফলে সাইবার ঝুঁকি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আইএমএফ সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা পণ্যের দামের চেয়ে জনগণের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। সংস্থাটি ব্যাপক হারে দাম নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ বা অরক্ষিত পরিবারগুলোর জন্য সাময়িক ও সুনির্দিষ্ট সহায়তার সুপারিশ করেছে। তহবিলটি জানিয়েছে যে, বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব সমন্বয় (fiscal consolidation) এখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা এখনো যৌক্তিক বলে বিবেচিত হলেও, প্রতিটি দেশের নিজস্ব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এর প্রয়োগ বা মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। যদি মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করা প্রয়োজন। মুদ্রার বিনিময় হারে বিশৃঙ্খল ওঠানামা রোধে সাময়িকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করা যৌক্তিক হতে পারে, তবে এটি সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিকল্প হওয়া উচিত নয়।
আর্থিক খাতের তদারকিকারীদের উচিত অত্যধিক ঋণনির্ভরতা বা লিভারেজ (leverage) নিয়ন্ত্রণ করা, বিশেষ করে প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ বা ঝুঁকির ক্ষেত্রে। সংস্থাটি দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট (পিআরজিটি) এবং দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিল (সিসিআরটি) অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছে। তহবিলটি জানিয়েছে, তাদের ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’-এর লক্ষ্য হলো ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার সুরক্ষা জোরদার করা।
জর্জিয়েভা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বাড়লেই দেশটির বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। বাজেট ঘাটতি কমানো এবং রাজস্ব ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সমন্বয় প্রয়োজন। জর্জিয়েভা চীনকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
মতামত (0)