জাতীয়

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত
মুক্তিযুদ্ধের অসীম সাহসী বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে। নড়াইলে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণের সাহসী সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর। যথাযোগ্য শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদার মধ্য দিয়ে দিনটি পালনের লক্ষ্যে নড়াইল জেলা প্রশাসন ও বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ ট্রাস্ট যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজকের এই দিনে ১৯৭১ সালে যশোরের গোয়ালহাটি ও ছুটিপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখসমরে তিনি অংশ নেন। সহযোদ্ধাদের নিয়ে বিওপির পজিশন রক্ষা করার সময় হঠাৎ পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। যুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর মর্টারের গোলা এসে তার ডান পায়ে লাগে, যা মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়।

নিজের জীবন সংকটাপন্ন জেনেও পিছু হটেননি নূর মোহাম্মদ শেখ। সহযোদ্ধা সিপাহী নান্নু মিয়াকে বাঁচাতে এবং অন্য সহযোদ্ধাদের নিরাপদ পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দিতে তিনি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে একাই হালকা মেশিনগান (এলএমজি) দিয়ে শত্রুর ওপর অবিরাম গুলি বর্ষণ করে যান। তার এই অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলের কারণে বাকি সহযোদ্ধারা নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন। তবে শত্রুর গুলিতে এই বীর সন্তান যুদ্ধক্ষেত্রেই শাহাদাতবরণ করেন।

পরবর্তীতে সহযোদ্ধারা তার মরদেহ উদ্ধার করে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে অভূতপূর্ব বীরত্ব, অসামান্য সাহসিকতা ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে। লাল-সবুজের মাঝে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ।

নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আমানত শেখ ও মায়ের নাম জেন্নাতুন্নেছা, মতান্তরে জেন্নাতা খানম। শৈশবেই তিনি তার বাবা-মাকে হারান এবং সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর, যা বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি) সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেন এবং পরবর্তীতে ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তিনি যশোর সেক্টরে বদলি হন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নূর মোহাম্মদ যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এস এ মঞ্জুর নেতৃত্ব দেন। নূর মোহাম্মদ যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ শত্রুমুক্ত করেন।

২০০৮ সালের ১৮ মার্চ তার গ্রামের নাম মহিষখোলা থেকে পরিবর্তন করে বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ রাখা হয়। সেই থেকে গ্রামটিতে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। এখানে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ নির্মিত হয়েছে।

২০০৮ সালের ১৮ মার্চ জাদুঘরটি উদ্বোধন হয়। এছাড়াও নূর মোহাম্মদের বসতভিটায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর নড়াইল জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এই মহান বীরকে স্মরণ করে থাকেন।

নড়াইল জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম জানান, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ নূর মোহাম্মদ নগরে দিনব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সশস্ত্র সালাম ও গার্ড অব অনার প্রদান, কোরআন তেলাওয়াত এবং বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। একটি শোভাযাত্রার আয়োজনও করা হয়েছে।

আজকের কর্মসূচিতে একটি আলোচনা সভাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নূর মোহাম্মদের জীবনীভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...