জাতীয়

সমুদ্রপথে অভিবাসন: মানবিক ট্র্যাজেডির অভিন্ন চিত্র

সমুদ্রপথে অভিবাসন: মানবিক ট্র্যাজেডির অভিন্ন চিত্র
সমুদ্রপথে অভিবাসন: মানবিক ট্র্যাজেডির অভিন্ন চিত্র
ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক ও বঙ্গোপসাগরে উন্নত জীবনের আশায় বা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে। মরক্কো-স্পেন সীমান্তে সম্প্রতি ৬০ হাজার মানুষের ঢল ও রোহিঙ্গা সংকট এই মানবিক ট্র্যাজেডির দুটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে।

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশি, আটলান্টিকের বিপজ্জনক পথ কিংবা বঙ্গোপসাগরের অন্ধকার রাত—বিভিন্ন সমুদ্রপথ ধরে হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবনের আশায় অথবা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে জীবন বাজি রেখে পাড়ি জমায়। কেউ ইউরোপের দিকে, কেউ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে যাত্রা করে। এই অভিবাসীদের ভাগ্য কেবল প্রকৃতির নির্মমতা দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সীমান্তনীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক প্রয়োগের বৈষম্যও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গত কিছুদিন আগে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা সীমান্তে একদিনে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের ঢল নামে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিরোধের মুখে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনা আবারও বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে অভিবাসন কেবল জনসংখ্যার স্থানান্তর নয়; এটি রাষ্ট্র, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের একটি জটিল প্রশ্ন।

একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রোহিঙ্গাদের নৌযাত্রা, বঙ্গোপসাগরে মৃত্যুর মিছিল এবং দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রহীনতার সংকট বিশ্ব রাজনীতির আরেকটি নীরব ট্র্যাজেডি হিসেবে রয়ে গেছে। ইউরোপের ক্ষেত্রে অভিবাসনের প্রধান প্রবেশপথ তিনটি—ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিকের ক্যানারি রুট এবং সেউতা-মেলিলার স্থলসীমান্ত। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাখ লাখ মানুষ ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে।

এদের মধ্যে কেউ যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসে, কেউ রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে, আবার কেউ দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে আশ্রয় খোঁজে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে ভেসে চলা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই বিশ্বের বৃহত্তম ‘রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর সদস্য’। তারা অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়ে নাগরিকত্বহীনতা, জাতিগত নিপীড়ন এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে পালাতে বাধ্য হয়।

ইউরোপীয় অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি প্রধানত মিশ্র অভিবাসন হিসেবে পরিচিত, যেখানে দ্বিতীয়টি মূলত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট অভিবাসন। তবে সমুদ্রে মৃত্যু—উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম নির্মম বাস্তবতা তৈরি করে।

২০১৫ সালের সিরীয় শরণার্থী সংকটের পর থেকে ইউরোপ অভিবাসন প্রশ্নে গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জার্মানি মানবিক অবস্থান গ্রহণ করলেও ইতালি, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডসহ অনেক দেশ সীমান্ত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সীমান্ত নজরদারি, ভূমধ্যসাগরে কোস্টগার্ড অভিযান, লিবিয়ার সঙ্গে সমঝোতা এবং তুরস্ক-ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি—এসবই মূলত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে বিবেচিত।

তবে সমালোচকেরা বলেন, সীমান্ত সুরক্ষা যত বেড়েছে, মৃত্যুও তত বেড়েছে। নিরাপদ পথ বন্ধ হওয়ায় অভিবাসীরা আরও বিপজ্জনক রুট বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সেউতার সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই কঠিন বাস্তবতার নতুন একটি অধ্যায়।

বঙ্গোপসাগরে রোহিঙ্গাদের নৌযাত্রা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও এক্ষেত্রে মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা কম নয়। বাংলাদেশের কক্সবাজার কিংবা ভাসানচর থেকে অনেক রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার আশায় দালালচক্রের হাতে পড়ে। অনেক নৌকা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সমুদ্রে ভেসে থাকে।

অনেকে খাদ্য ও পানির অভাবে মারা যায়, অনেকে ডুবে যায়। অনেককে কোনো রাষ্ট্রই গ্রহণ করতে চায় না, যা রাষ্ট্রহীন মানুষের জন্য রাষ্ট্রহীন সমুদ্রের এক করুণ চিত্র। ইউরোপে অভিবাসনকে প্রায়শই অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় রোহিঙ্গা সংকটকে দেখা হয় মানবিক দায়িত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি সমস্যা হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন হলো—সীমান্ত কতটা উন্মুক্ত হবে, মানবাধিকার কতটা অগ্রাধিকার পাবে এবং নিরাপত্তা ও মানবিকতার ভারসাম্য কোথায় স্থাপিত হবে। বিশ্বের নেতৃত্ব এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ কয়েক মিলিয়ন ইউক্রেনীয়কে দ্রুত আশ্রয় দিয়েছে। তবে একই ইউরোপ আফ্রিকান ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু শরণার্থীর ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষকেরা ইউরোপীয় নীতির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক "নির্বাচিত মানবিকতা" ধারণাটি ব্যবহার করেন।

অর্থাৎ মানবিকতার প্রয়োগ অনেক সময় ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। দশ থেকে পনের লক্ষের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দেওয়া একটি ছোট অর্থনীতির জন্য সহজ কাজ নয়। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অবস্থানে স্থাপন করেছে। যখন ইউরোপ সীমান্ত রক্ষায় কঠোর হয়, তখন বাংলাদেশ মানবিকতা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...