আন্তর্জাতিক

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে: সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে: সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে: সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধি সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে রয়েছে। সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় বিকল্প পথ ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা হ্রাস পাওয়াই এর প্রধান কারণ।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন হ্রাস পাওয়ায় সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এরপরও ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে।

এর প্রধান কারণ হলো, সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদাও কমেছে। বিকল্প পথে তেল রপ্তানি চলমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো দেশগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধিও তেলের দামের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে একই সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমায় সরবরাহের ঘাটতির চাপ অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ কারণে ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপর স্থায়ী হয়নি। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর্গাসের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এখন দিনে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হচ্ছে। প্রায় ৭ মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর দিকে এই পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল।

গত ৩০ আগস্ট সংঘাত আবার শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। সংঘাত শুরুর পর এটি দ্রুত কমে দিনে ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। তবে দৈনিক গড় হিসাবে এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কে-প্লারের তথ্যমতে, ২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বের হতে দেখা যায়নি। তবে শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব বলছে, প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি এখনো চলমান রয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। হরমুজের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা চলছে। এতে সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব কিছুটা কমেছে। সৌদি আরামকো আগস্ট মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাস তানুরা বন্দর থেকে আবার জাহাজে তেল তোলা শুরু করেছে।

তবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে রপ্তানি কমেছে। ইরানপন্থী ইয়েমেনের হুতিদের নৌ অবরোধের কারণে বন্দরটি চাপের মুখে রয়েছে। আগস্টে ইয়ানবু থেকে দিনে গড়ে ১৪ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। এর আগের ৩ মাসে এই গড় ছিল ৩৯ লাখ ব্যারেল।

মিসরের সিদি কেরি বন্দর থেকে আগস্টে দিনে ২১ লাখ ৩৯ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, যা জুনের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। আগস্টে ইরাকের তেল রপ্তানিও বেড়ে দিনে প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে উঠেছে। জুলাই ও আগস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি ছিল দিনে প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল। একই সময়ে কুয়েতের অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি ছিল প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল।

অন্যান্য দেশও তেল উৎপাদন বাড়াচ্ছে। রিস্টাড এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা জারান্ড রিস্টাডের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গায়ানাসহ ওপেকের বাইরে থাকা কয়েকটি দেশ চলতি বছর সম্মিলিতভাবে দিনে আরও ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঘাটতির একাংশ এতে পূরণ হচ্ছে।

জুলাই ও আগস্টে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দিনে প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেলে স্থির ছিল। জুনে তা ৬৪ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির তেল পরিশোধন কমেছে। তবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখনো ২৩ শতাংশ বেশি। রাশিয়া ২০২৬ সালের তেল উৎপাদনের পূর্বাভাস ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদাও কমছে। রিস্টাডের হিসাবে, পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন জ্বালানিতে তেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ৩৫ লাখ ব্যারেল কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই চাহিদা ছিল ৪৫ লাখ ব্যারেল।

চাহিদা যত কমেছে, তার অর্ধেকের বেশি কমেছে চীনের ক্ষেত্রে। সেখানে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের প্রসার ঘটছে। ফলে তেলনির্ভর জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যালের চাহিদা কমছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন জুলাই ও আগস্টে সমুদ্রপথে দিনে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে।

রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তির হিসাবে, বর্তমান সরবরাহের ভিত্তিতে ব্রেন্টের ‘ন্যায্য’ দাম হওয়া উচিত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলার। তবে আজ মঙ্গলবার ব্রেন্টের দাম ৯৮ ডলারের ওপর ছিল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...