জাতীয়

ডেঙ্গুর থাবায় বিপর্যস্ত গৃহকর্মী হাজেরার পরিবার, ৫ জন আক্রান্ত

ডেঙ্গুর থাবায় বিপর্যস্ত গৃহকর্মী হাজেরার পরিবার, ৫ জন আক্রান্ত
ডেঙ্গুর থাবায় বিপর্যস্ত গৃহকর্মী হাজেরার পরিবার, ৫ জন আক্রান্ত
রাজধানীর মনসুরাবাদ এলাকার গৃহকর্মী হাজেরা বেগমের পরিবারের ১১ সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। ছোট ছেলে আনিস মিয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন, যেখানে হাজেরা ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।

গৃহকর্মী হাজেরা বেগম (৫০) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত। রাজধানীর মনসুরাবাদ এলাকার এই পরিবারের ১১ জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন হাজেরা বেগমের দুই ছেলে, দুই ছেলের স্ত্রী এবং ১৫ মাস বয়সী নাতনি।

হাজেরা বেগমের ছোট ছেলে আনিস মিয়া (২৪) গত পাঁচ দিন ধরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আনিসকে গত ২৮ আগস্ট প্রথম হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ডেঙ্গু ধরা পড়লেও শয্যা খালি না থাকায় সে সময় তাঁদের বাসায় ফিরে যেতে হয়।

এরপর গত ৩০ আগস্ট রাতে আনিসের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সে বমি করতে করতে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তখন দ্রুত তাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় এবং ভর্তি করা হয়। আনিসের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে হাজেরা বেগম বলেন, "মেয়ের বাসায় নিয়ে রাখছিলাম। রোববার বমি করতে করতে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। আবার এইখানে নিয়ে আসছি। তারপর ভর্তি করছে।"

গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালান হাজেরা বেগম। ছেলের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তিনি ছেলের চিকিৎসার জন্য আরও দুই হাজার টাকা ধার করে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, "কত খরচ! অনেক চাপ যাইতেছে। এখন ধারদেনা কইরা এই চিকিৎসা চালাইতেছি।"

পরিবারের অন্য চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত সদস্য বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাজেরা বেগম জানিয়েছেন, তাঁর বড় ছেলে হাবিব মিয়ার শারীরিক অবস্থাও ভালো নয় এবং তাকেও হয়তো হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে। এই পরিবারের ১৫ মাস বয়সী নাতনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। ৪২৪ নম্বর নারী ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ৪১টি শয্যার মধ্যে ৪০টিতেই রোগী ভর্তি আছেন। পুরুষ ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৫০টি শয্যার মধ্যে ৪০টিতে রোগী আছেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকার বাসিন্দা।

হাসপাতালে আরও অনেক রোগী ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়ছেন। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. নিয়ামুল গত বৃহস্পতিবার রাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। তার বাবা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নুরুল আমিন জানিয়েছেন, ছেলের খাওয়ার রুচি নেই এবং তাকে জোর করে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন।

১২ বছরের ছোট্ট তানহাও নারী ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি। হাতে ক্যানুলা লাগানো তানহার জ্বর শুরু হয়েছিল গত মঙ্গলবার। তিন দিন বাড়িতে সেবাযত্ন করার পর গত মঙ্গলবার পেট ও বুকব্যথা শুরু হলে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। তার মা মাকসুদা বেগম জানান, তানহার এখন শরীরের ব্যথাটাই আছে, পেটব্যথা বেশি, পেট ফুলে আছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং খাওয়ার রুচি নেই।

কল্যাণপুরের নির্মাণশ্রমিক মো. ফজলুল গত তিন দিন ধরে তাঁর ছেলে মো. শহিদকে নিয়ে এই হাসপাতালে আছেন। শহিদের সাত দিন ধরে জ্বর। ফজলুল গত দুই দিন কাজে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, "এখন করার কিছু আছে ভাই? পোলাটাকে তো ফেলে থুয়ে যাওয়া সম্ভব না।"

রাজশাহী থেকে ছেলের কিডনির অস্ত্রোপচার করাতে পরিবারসহ ঢাকায় এসেছিলেন গাড়িচালক মো. আনোয়ার। কিন্তু এখানে এসে তাঁর মেয়ে রিয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। গতকাল শুক্রবার তিনি মেয়েকে এই হাসপাতালেই ভর্তি করিয়েছেন। আনোয়ার বলেন, "গাড়ি তো চালাইতে পারতেছি না। আয় একেবারে বন্ধ। ছেলেকে নিয়ে ওর মা ঢাকায় ছিল। অপারেশনের জন্য আমরা বাবা-মেয়ে আসছিলাম। এখন আবার মেয়ের অসুখ হলো।"

আগারগাঁও এলাকার সাদ আহম্মদ আট দিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁর রক্তের অণুচক্রিকা ১৪ হাজারে নেমেছিল, যা গতকাল বেড়ে ৩১ হাজার হয়েছে। তিনি মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "কখনো স্প্রেগুলা ছিটাইতে দেখি না। স্প্রে ছিটাইলে তো আর এত ডেঙ্গু হতো না।"

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিমও সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের গাফিলতি নিয়ে অভিযোগ করেছেন। তিন দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে থাকা ইব্রাহিম বলেন, "(মশা নিধনের) ওষুধ দেওয়া মানে খালি ধুমা (ধোঁয়া)। চুরি করতে করতে ওষুধের টাকা খাইয়া লায়। আর কেরোসিন ভইরা খালি ধুমা দেয়। মশা ওই ধুমার ওপরে খেলা করে।"

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...