রাজনীতি

দুর্বল মানবাধিকার ও গুম বিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

দুর্বল মানবাধিকার ও গুম বিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট
দুর্বল মানবাধিকার ও গুম বিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। আজ রোববার বিল দুটি পাসের প্রক্রিয়া শুরুর আগে তারা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। আজ রোববার বিল দুটি পাসের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। বিল দুটি দুর্বল আকারে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করে তারা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে।

গত ২৭ আগস্ট সংসদে বিল দুটি উত্থাপন করা হয়েছিল। সেদিনও বিল দুটি উত্থাপনের আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। এরপর সংসদীয় কমিটিতে বিল দুটি নিয়ে আলোচনায়ও অংশ নেয়নি বিরোধী দল।

বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার ভুক্তভোগী জনগণ, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাসমূহের মতামত উপেক্ষা করেছে। তারা একতরফাভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশ দুটি রহিত করেছে। বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের বিল আনা হয়েছে বলে বিরোধী দল দাবি করেছে। আজ রোববার দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে মানবাধিকার কমিশন বিল অবিলম্বে বিবেচনার জন্য উত্থাপনের আহ্বান জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর চান।

মাইক পাওয়ার পর তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর দুটি বিল আসবে, যা আগেই উত্থাপিত হয়েছে। শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, ‘আমরা আগেই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলাম। ট্রেজারি বেঞ্চের পক্ষ থেকে যখন বিলগুলো ল্যাপস (অকার্যকর) করা হয়, তখন বলা হয়েছিল যে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আরও ভালো আকারে তারা নিয়ে আসবে।’

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, মানবাধিকারসংক্রান্ত বিলে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তার তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, আইনের দ্বৈত প্রয়োগ হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী রাষ্ট্রের কর্মচারী হলেও তারা এ দেশের নাগরিক। একই অপরাধে একজনের জন্য সরাসরি তদন্ত করা যাবে এবং আরেক জায়গায় আটকে পড়ে যাবে, এটা হতে পারে না।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ল্যাপস করে এই সমস্ত আইন দুর্বল ফর্মে আনা হচ্ছে, এ জন্য আমরা এই আইন পাস করার অংশীদার হব না।’ তিনি স্পষ্ট করেন, ‘সেই জায়গা থেকেই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট যে আমরা এ আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি।’ স্পিকার তাকে ওয়াকআউট করার জন্য ধন্যবাদ জানানোর পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।

ওয়াকআউটের পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে যান। পরে সংসদের টানেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি আজকের সংসদ অধিবেশনকে জাতীয় সংসদের ইতিহাসে অন্যতম একটি কালো দিন বলে অভিহিত করেন।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিল সংসদে আনার সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে চাইলেও তাকে যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সংসদের ঐতিহ্য অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতাকে কথা বলার জন্য ফ্লোর ওপেন করে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই জায়গায় বিরোধীদলীয় নেতাকে সেই সম্মান করা হয়নি এবং স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন।

নাহিদ আরও অভিযোগ করেন, ওয়াকআউটের সময় এটিকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে মশকরা করা হয়েছে। স্পিকারের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশাজনক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার দাবি, সরকার দেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকুক তা চায় না। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে যেভাবে মানবাধিকার হরণ ও গুম হয়েছিল, সরকার আবারও সেই পথ খোলা রাখতে চায় বলে তিনি জানান।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার আগে শক্তিশালী ও কার্যকর আইন করার কথা বললেও এখন তুলনামূলক দুর্বল বিল আনা হয়েছে। এ কারণেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে তারা ওয়াকআউট করেছে।

এদিকে, বিরোধীদলের তীব্র প্রতিবাদ, বিরোধিতা ও ওয়াকআউটের মধ্যেই সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে দুটি আইন মানবাধিকার রক্ষা-সংক্রান্ত এবং অপরটি পিতা-মাতাকে আজীবন ভোগস্বত্ব বজায় রেখে সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ প্রদান-সংক্রান্ত। মানবাধিকার রক্ষা-সংক্রান্ত মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধে আনীত বিল দুটিকে ‘দুর্বল’ আখ্যা দিয়ে বিরোধীদল ওয়াকআউট করে।

পরে তৃতীয় বিল পাসের সময়ও তারা আপত্তির কথা জানিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সংসদ অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে। বিরোধীদলের এসব আপত্তি তোয়াক্কা না করেই বিলগুলো পাস করা হয়। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল ২০২৬’ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সমালোচনা ও উদ্বেগ জানিয়েছিল।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে গুমের ঘটনার তদন্তের মূল দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। এ আইনে করা মামলা একজন নির্দিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, সাধারণত উপপরিদর্শক পদমর্যাদার, তদন্ত করবেন। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে গুমের ঘটনা সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করার ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...