সারাদেশগুমের বিচার ও সঠিক আইন প্রণয়নের দাবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভায়
গুমের বিচার ও সঠিক আইন প্রণয়নের দাবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভায়
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনা সভায় গুমের অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং সঠিক আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। বক্তারা প্রস্তাবিত আইনের দুর্বলতা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। ‘শুনতে কী পাও?’ শীর্ষক এই সভা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম গুমের অপরাধীদের অবিলম্বে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, অপরাধীদের কোনো ধরনের সুরক্ষা না দিয়ে সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, এখন এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যা উল্টো অপরাধীদের রক্ষার পথ তৈরি করতে পারে। তিনি গুম প্রতিরোধ আইনের ১৪ ধারার দুর্বলতা তুলে ধরেন। এই ধারায় বলা হয়েছে, যে বাহিনী অপরাধ করবে, সেই বাহিনী ছাড়া অন্য বাহিনী তদন্ত করবে।
তিনি জানান, গুমের ঘটনায় এক বাহিনী অন্য বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করেছে এবং ভুক্তভোগীকে হস্তান্তর করেছে। ফলে কোন বাহিনী অপরাধ করেছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে আইনটি বাস্তবে অকার্যকর হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তাজুল ইসলাম বর্তমান সরকারকে সঠিক আইন প্রণয়ন ও গুমের অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সরকারি দল ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা জুলাইয়ের মহাবিপ্লব ঘটাতে পেরেছে, তারা প্রয়োজনে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক প্রধান নূর খান লিটনও সভায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ নতুন এক পথচলা শুরু করলেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মনে এখনো প্রশ্ন, তাঁদের স্বজনেরা কি বেঁচে আছেন? গুম কমিশনের মাধ্যমে কিছু ঘটনার আভাস পাওয়া গেলেও এখনো কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি।
নূর খান বলেন, গুমের ঘটনাগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ডিবি, র্যাব বা ডিজিএফআই পরিচয়ে ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হতো। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি।
তিনি গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ত্রুটি তুলে ধরেন। অধ্যাদেশে ‘আন্তঃবাহিনী তদন্তের’ কথা বলা হচ্ছে, যা ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব করে তুলবে। যে বাহিনী অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের মাধ্যমেই তদন্ত করা হলে সত্য কখনো বেরিয়ে আসবে না।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম সভায় বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পার হলেও আমরা আজও গুমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে পারিনি। যেসব আইন বা কমিশন গঠন করা হচ্ছে, সেগুলো যদি কেবল কাগজে-কলমে থাকে এবং বাস্তবে জনগণের অধিকার রক্ষায় ‘বিকলাঙ্গ’ হয়ে পড়ে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। একজন ভুক্তভোগী হিসেবে এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা কঠিন বলে তিনি জানান।
গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের বড় ভাই মতিউর রহমান তাঁর ভাইয়ের ঘটনা বর্ণনা করেন। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল র্যাব-২ পরিচয়ে তাঁর ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি পরবর্তী তিন দিন ঢাকার ৪৮টি থানাসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় তাঁকে খুঁজেছেন, কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি।
মতিউর রহমান ডিবি কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো ফল পাননি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা চললেও তাঁরা এখন পর্যন্ত জাকিরের কোনো সুনির্দিষ্ট খোঁজ পাননি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, তাঁর ভাই জীবিত থাকলে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক, আর যদি হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে অন্তত তাঁর লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
উল্লেখ্য, গত ২৭শে অগাস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উত্থাপিত বিলটির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। গুমসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পৃথক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে রাখার বিষয়টি নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেছেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, পিএইচডি গবেষক নওশীন শর্মিলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম এবং ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. শাহিনুর রহমান। আলোচনা শেষে ‘জোয়ার’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্রটি ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অফিশিয়াল মনোনয়ন পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের বগুড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা জাতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে।
মতামত (0)