জাতীয়হাইকোর্টে নুসরাত হত্যা মামলার রায়: ২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৪ জনের যাবজ্জীবন, ১০ জন খালাস
হাইকোর্টে নুসরাত হত্যা মামলার রায়: ২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৪ জনের যাবজ্জীবন, ১০ জন খালাস
নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্ট দুই আসামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনকে যাবজ্জীবন এবং দশজনকে খালাস দিয়েছেন। একইসাথে নিম্ন আদালতের বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেছেন। এই রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একইসাথে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দশজনকে খালাস দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন। সোয়া দুই ঘণ্টাব্যাপী এই রায় ঘোষণা করা হয়, যেখানে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা পুরো রায় পড়ে শোনান।
হাইকোর্ট একইসাথে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই মামলায় নির্বিচারে ফাঁসির রায় দেওয়ায় তার বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশনা আসে। আদালত বলেছেন, বিচারিক আদালত এভাবে নির্বিচারে ফাঁসি দিতে গিয়ে যেভাবে প্রতিটা পরিবারের ওপর একটি বিপর্যয় নেমে এসেছে, এইজন্য তার বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।
আদালতে আসামীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতের এজলাস কক্ষে আসামী ও ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন।
গত ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় আসামীদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছিল। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ পেপারবুক থেকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই শুনানি শুরু করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয়াদি হাইকোর্টে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনতে গত ১০ জুন একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। গঠিত দ্বৈত বেঞ্চটি গত ১৪ জুন থেকে তার কার্যক্রম শুরু করে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এই ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ওই বছরের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। অগ্নিসন্ত্রাসের এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান সোনাগাজী থানায় একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
এই মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামী ছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন।
এছাড়াও মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম এবং মহি উদ্দিন শাকিলও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।
ডেথ রেফারেন্সের জন্য নুসরাত হত্যা মামলার রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়। এটি ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল দায়ের করেন।
মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ৩৩ দিনে তদন্ত শেষ করে। এরপর বিচারিক আদালতে ৬১ কার্যদিবস বিচার চলার পর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এবার উচ্চ আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হলো ছয় বছর আট মাস পর।
পর্যবেক্ষণের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, একজন বিচারকের কোনো মামলায় দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের বিচারিক মন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, বিচারক মামুনুর রশিদ সেই বিচারিক মন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন বলে হাই কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তবে তিনি জানান, এই পর্যবেক্ষণ নির্দিষ্ট ওই বিচারকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ঢালাওভাবে সব বিচারকের ক্ষেত্রে নয়।
মতামত (0)