জাতীয়

হাম: উপসর্গ, জটিলতা ও প্রতিরোধে করণীয়

হাম: উপসর্গ, জটিলতা ও প্রতিরোধে করণীয়
হাম: উপসর্গ, জটিলতা ও প্রতিরোধে করণীয়
দেশে হামে মৃত্যু ও জটিলতা বাড়ছে। স্কয়ার হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন কনসাল্ট্যান্ট হামের লক্ষণ, ছোঁয়াচে প্রকৃতি, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। হাম থেকে সেরে ওঠা অনেক শিশু হাম-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে। হামের সংক্রমণ ও এর ফলে সৃষ্ট জটিলতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন।

হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের মতোই হয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, সর্দি, শারীরিক দুর্বলতা, চোখ লালচে হয়ে যাওয়া এবং চোখ থেকে পানি পড়া। সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার তিন থেকে পাঁচ দিন পর শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়। এই র‍্যাশ প্রথমে শরীরের ওপরের অংশ, যেমন কানের পেছনের ত্বক, চুল ও ত্বকের সংযোগস্থল এবং মুখ থেকে শুরু হয়। এরপর তা পেট, পিঠ ও হাত-পায়েও ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে চুলকানিও থাকে। হাম হলে মুখের ভেতরে কপলিক স্পট নামে একটি বিশেষ দাগ দেখা যায়, যা চিকিৎসকরা রোগীকে পরীক্ষার সময় শনাক্ত করেন।

হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এই রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে জীবাণু অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। একই বাড়িতে বসবাসকারী অন্যদের মধ্যে হামের জীবাণু খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা হামে আক্রান্ত হবেন কি না, তা তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

একবার হামের সংক্রমণ হলে শরীরে এর বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি সারা জীবন হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। হামের টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও হাম হতে পারে, তবে টিকা দেওয়া থাকলে হাম-পরবর্তী জটিলতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়, যেখানে কোনো কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, তাদের ক্ষেত্রে একবার সংক্রমণ বা টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও পুনরায় হাম হতে পারে।

মারাত্মক কোনো জটিলতা না থাকলে শিশুকে বাড়িতে রেখেই হামের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরি। কোন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, সে সম্পর্কে অভিভাবকদের অবগত থাকতে হবে।

হাম হলে শিশুকে গোসল করাতে কোনো বাধা নেই। গোসলের সময় শিশুর উপযোগী সাবান-শ্যাম্পু ব্যবহার করা যাবে, তাতে কোনো ক্ষতি হয় না। হামের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয় না। হাম-পরবর্তী ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে। জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেও জটিলতার ঝুঁকি এড়ানো যায় না; কেবল জটিলতা দেখা দিলেই একজন চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নির্দেশনা দেন।

হামের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া থেকে মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক শিশুর নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ), সেপটিসেমিয়া (রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া), মারাত্মক ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এবং কানের সংক্রমণ হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি। হাম-পরবর্তী জটিলতায় এ বছর বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস, শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, খাবার বা তরল খেতে না পারা, অতিরিক্ত ঘুম ভাব, নেতিয়ে পড়া, এলোমেলো কথা বলা, খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো, প্রস্রাব কমে যাওয়া, একটানা অতিরিক্ত জ্বর কিংবা অতিরিক্ত ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে পরিস্থিতি গুরুতর বলে বুঝতে হবে। এমন ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।

হাম নিরাময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক কিছু ওষুধ দেন, যা রোগীর কষ্ট উপশম করে। শিশুর বয়স অনুযায়ী সুষম পুষ্টি ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ও দৃষ্টিশক্তিকে সুরক্ষা দিতে ভিটামিন এ ক্যাপসুলও খাওয়ানো হয়। জ্বর থাকলে কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মোছানো যায়। এই সময়ে বিশ্রামও প্রয়োজন। অসুস্থ হলে শিশুর খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপের প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়।

পরিবারের শিশুদের হাম থেকে বাঁচাতে টিকা দেওয়ার বয়স হলেই শিশুকে হামের টিকা দেওয়া উচিত। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের শিশু বিভাগের একজন অ্যাসোসিয়েট কনসাল্ট্যান্ট এই তথ্যগুলো দিয়েছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...