সারাদেশজৈন্তাপুরে চোরাচালান ও আধিপত্য ঘিরে দুই দিনের সংঘর্ষ, আহত বহু
জৈন্তাপুরে চোরাচালান ও আধিপত্য ঘিরে দুই দিনের সংঘর্ষ, আহত বহু
সিলেটের জৈন্তাপুরে আধিপত্য ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানা দুই দিনের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাও আহত হন।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের ঘিলাতৈল গ্রামে আধিপত্য বিস্তার এবং অবৈধ চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিন ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান ও সাবেক ইউপি সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষে পথচারীসহ অন্তত দশজন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লাও আহত হন।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রথম দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় পথচারীসহ প্রায় ১৮ জন আহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে পাঁচজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানো হয়েছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বৃহস্পতিবার রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হতে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে গ্রেপ্তারের সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছিল।
তবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ বজায় ছিল। এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে পুনরায় উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এই দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ চলে।
শুক্রবার সকালের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে বর্তমান ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ দাবি করেছেন। সংঘর্ষে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে; মনসুর আহমদের দাবি, প্রতিপক্ষের লোকজন প্রায় ১০টি ঘরবাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙচুরের প্রকৃত সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
খবর পেয়ে জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তিনি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলীসহ স্থানীয়দের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকালে তিনিও আহত হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘিলাতৈল সীমান্ত সড়ককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ চোরাচালান, মানবপাচার ও বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। এসব অবৈধ কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বর্তমান ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ ও সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়ার লোকজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের পণ্য আসার পথে চাঁদা তোলা নিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জেরে রাতেই উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে এলাকায় মানবপাচার ও চোরাচালান বেড়েছে। এলাকার যুবসমাজ এসবের প্রতিবাদ করে আসছে। তিনি দাবি করেন, মুন্না এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখায় সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়া এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। মনসুর আহমদ আরও দাবি করেন, বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার পথে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে পথরোধ করে মারধর করেন, যা পরবর্তীতে সংঘর্ষের কারণ হয়।
অন্যদিকে, সাবেক ইউপি সদস্য পংকি মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন যে, বর্তমান ইউপি সদস্য মনসুর আহমদ একজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং তার বিরুদ্ধে মাদক, অবৈধ চোরাচালান, মানবপাচার ও হুন্ডি কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। পংকি মিয়ার অভিযোগ, মনসুর ও তার বাহিনী অবৈধভাবে লোকজনকে সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতা করছে এবং এলাকাবাসী এর প্রতিবাদ করলে তারা লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ চালায়।
জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় দুই পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরপর দুই দিনে একই এলাকায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনায় ঘিলাতৈলসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ হিসেবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাফিজ ও দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহারুল আলম বাহারের আহ্বানে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এলাকাবাসী সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মতামত (0)