যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ধসে পড়েনি। তবে এই আপাত স্থিতিশীলতা ধরে রাখার জন্য সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে, যাদের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া এবং নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। কোটি কোটি ইরানির জীবন তাই ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, একটি বহুমুখী অভ্যন্তরীণ উৎপাদনব্যবস্থা এবং বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্কই দেশটিকে অর্থনৈতিক ধসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু এই সক্ষমতা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারেনি, বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে আরও প্রকট করে তুলছে। প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হলেও, তারা শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকেনি।
কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও সেবাখাতকেও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সীমান্ত বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, সমুদ্রপথে বিকল্প বাণিজ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানির নানা কৌশল ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের আরও ১৩০ মিলিয়ন ডলার জব্দ করা হয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারলেও, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, গত বছরের জুন থেকে শুরু হওয়া দুটি যুদ্ধ, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক দফা ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, আয় কমছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির গবেষক এবং কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ফেলো হাদি কাহালজাদেহ বলেন, কোনো অর্থনীতিকে তখনই ধসে পড়া বলা যায়, যখন সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং রাষ্ট্র কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ বা মৌলিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের অর্থনীতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি এবং যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যত কঠিনই হোক না কেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন না।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে তীব্রভাবে আঘাত করছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে, যা পরিবারগুলোর ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মান ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েই চলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব, যার কারণে নতুন পণ্যের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে এবং বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ২৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ। এটি ইরানের অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি করছে, যদিও তারা তেল রপ্তানি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা শুরু করেছে, যা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে। বুধবার রাতে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের আগের দিনের হামলার চেষ্টার জবাবে করা হয়েছে। এই হামলাগুলো কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ এতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, হামলার সময় ইরানের কেশম, কিশ, বন্দর আব্বাস, আবাদান ও বুশেহর এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাস সংরক্ষণ ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে জানিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বাহিনী পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালায়, অন্যদিকে জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবারই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, যদিও তিনি কূটনৈতিকভাবে শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরান নিশ্চিত করেছে যে তারা জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তারা বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যৌথভাবে পরিচালনার জন্য ওমানের দেওয়া প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া ও ইরানের ওপর আগের চেয়েও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি দ্বিদলীয় বিল অনুমোদন পেয়েছে, যা ৮৬-১২ ব্যবধানে সেনেটে পাস হয়। এই বিলের আওতায় রাশিয়া এবং রুশ তেল ও গ্যাসের ক্রেতা দেশগুলো কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে এবং ইরানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও বিস্তৃত হবে। বিলটির অন্যতম রূপকার সাউথ ক্যারোলাইনার প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা হয়েছে।



মতামত (0)