জাতীয়খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘে আস্থা ফেরানোর আশা গুতেরেসের
খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘে আস্থা ফেরানোর আশা গুতেরেসের
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর নেতৃত্বে ভূরাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের আশা প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) নতুন সভাপতি খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে ভূরাজনীতিতে বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও সদিচ্ছা পুনর্গঠন করা সম্ভব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করে তাঁর কার্যক্রম শুরু করেন।
মহাসচিব গুতেরেস বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নেতৃত্বকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, কূটনীতি, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদ এই আস্থা ও সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের মানুষের জন্য আরও ভালো, স্বাস্থ্যকর ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পেল। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
খলিলুর রহমান এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিলুর রহমান বলেন, ৮০তম সাধারণ পরিষদ থেকে ৮১তম সাধারণ পরিষদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার এই সময়ে সংলাপ, সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের মাধ্যমে অগ্রগতি সম্ভব করতে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। যুদ্ধ, মানবিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে জাতিসংঘের ওপর মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারও করেন তিনি।
বিদায়ী সভাপতি জার্মানির আনালেনা বেয়ারবকের কাছ থেকে আইসল্যান্ডের তৈরি ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাতুড়ি গ্রহণের পর খলিলুর রহমান তাঁর এক বছরের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মূল প্রতিপাদ্য হলো—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: এমন একটি জাতিসংঘ, যা সবার জন্য কাজ করে।’
খলিলুর রহমান বলেন, আমাদের জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর শোনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এটি ১৯৪৫ সাল নয়, এটি ৮১তম অধিবেশন; বিশ্ব এগিয়ে গেছে এবং এই সংস্থাকেও এগিয়ে যেতে হবে। তিনি সেই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবেন বলে জানান।
মহাসচিব গুতেরেস উল্লেখ করেন যে, খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিশ্ব নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সংঘাত, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি, দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য ও বৈষম্য এবং আরও খারাপ হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকট রয়েছে।
গুতেরেস বলেন, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনর্গঠন করাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই অস্থির সময়ে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা পর্যন্ত বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বলে গুতেরেস মন্তব্য করেন।
গত ২ জুন গোপন ব্যালটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন ড. খলিলুর রহমান। নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পান, যেখানে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পান ৯১ ভোট। জাতিসংঘের আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থায় এবারের সভাপতি পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ড. খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণকে বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত’ ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতিফলন হচ্ছে এই অর্জন।
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ আরও বলেন, দেশের স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি নতুন আস্থা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মনোনয়ন এবং ড. খলিলুর রহমানের পেশাদার কূটনৈতিক দক্ষতা ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অগ্রাধিকার ও উদ্বেগ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মনে করেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ঢাকা।
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সহযোগিতা চাইছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও কূটনৈতিক পরিসর আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ড. খলিলুর রহমানের বিজয়কে আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকা রাখার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘সফট পাওয়ার’ ও উদীয়মান শক্তি হিসেবে সহযোগিতা, সংলাপ ও সদিচ্ছার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরও এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো একক দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন না; বরং ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের স্বার্থ ও কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছিলেন, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে এবং জাতিসংঘ বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা বাড়াতে সব সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
তাঁর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নারী ও কন্যাশিশু এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন। ড. খলিলুর রহমানের মেয়াদকালেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের শেষ বৈঠকে বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক বলেন, জাতিসংঘের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভব করছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো দিন বা এমন কোনো দেশ নেই, যা জাতিসংঘ ছাড়া আরও ভালো অবস্থায় থাকবে।
যাঁরা জাতিসংঘকে অপ্রাসঙ্গিক বা ব্যর্থ বলে মনে করেন, বিশেষ করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, তাঁদের জাতিসংঘবিহীন একটি বিশ্বের বিকল্পটি বিবেচনা করার আহ্বান জানান বেয়ারবক। সাধারণ পরিষদের বিদায়ী সভাপতি বলেন, জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) না থাকলে লাখো শিশু বিদ্যালয়ে যেতে পারত না। আবার জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা কাছাকাছি মোতায়েন থাকায় নারীরা ধর্ষণের ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পান।
মতামত (0)