জাতীয়মদিনায় আগমনের পর মহানবী (সা.) এর প্রথম বার্তা
মদিনায় আগমনের পর মহানবী (সা.) এর প্রথম বার্তা
মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) নতুন নগরবাসীকে চারটি মৌলিক বার্তা দেন: ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান, সালামের প্রসার, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখা এবং রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়।
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানান্তরের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি নতুন মানবিক রাষ্ট্র এবং আদর্শ সমাজ গঠনের ঐতিহাসিক সূচনা। মদিনা ছিল বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের আবাসস্থল। সেখানকার প্রধান দুটি গোত্র আউস ও খাজরাজ তখন দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-বিগ্রহে ক্লান্ত ছিল।
আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনায় পৌঁছে নতুন নগরবাসীকে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা দেন। তিনি চারটি গভীর মানবিক ও আত্মিক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসের সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার কথা বলেন। মদিনার ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন, এই ঘটনার বর্ণনা দেন।
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন প্রথম মদিনায় পদার্পণ করেন, তখন চারপাশ থেকে মানুষ তাঁকে দেখার জন্য ভিড় করে। তিনি ভিড়ের মধ্যে গিয়ে তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়েছিলেন। এক পলক দেখেই তাঁর অন্তরাত্মা বলে ওঠে যে এটি কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না।
মহানবী (সা.) সমবেত জনতার উদ্দেশে সর্বপ্রথম যে বাণীটি উচ্চারণ করেন, তা ছিল: "হে লোকসকল, তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করো, সমাজে সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটাও, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখো এবং রাতে মানুষ যখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকে তখন নামাজ (তাহাজ্জুদ) আদায় করো; তবেই তোমরা পরম শান্তিতে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)। এই বার্তাটি সামাজিক ও আত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
প্রথমত, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একটি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পূর্বশর্ত হলো মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা বিধান করা। পেট ভরা না থাকলে কোনো জাতি উন্নত সংস্কৃতি বা নৈতিকতার চর্চা করতে পারে না। অভাব ও ক্ষুধা দূর না হলে কোনো রাষ্ট্রেই অপরাধ ও সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
মহানবী (সা.) অন্নসংস্থানকে একটি বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি শিক্ষা দেন যে, যেকোনো উপায়ে সমাজের কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, সালামের প্রসার ঘটানোর কথা বলা হয়, যা পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে। রাস্তাঘাটে চলাচলের সময়, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা যেকোনো সামাজিক মিলনে পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে একে অপরকে আন্তরিকভাবে অভিবাদন জানানো পারস্পরিক হৃদ্যতা তৈরির সেরা মাধ্যম। অজ্ঞতা ও দূরত্ব থেকেই ভয় জন্ম নেয় এবং সেই ভয় পরবর্তীতে বিদ্বেষে রূপ নেয়।
ইসলামি সম্ভাষণ ‘আসসালামু আলাইকুম’ নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়। এটি হলো মহান আল্লাহর পবিত্র গুণবাচক নাম ‘আস-সালাম’-এর মাধ্যমে অপর ভাইয়ের নিরাপত্তা ও শান্তি কামনা করা। যখন একজন মানুষ অন্যজনকে বলে—‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’, তখন তা দুজনের মাঝে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে।
তৃতীয়ত, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা পারিবারিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। পরিবার হলো যেকোনো সুস্থ সমাজের ক্ষুদ্রতম অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। একটি পরিবার যখন ভাঙনের মুখে পড়ে, আত্মীয়-স্বজনের যোগাযোগ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে যায়।
প্রিয় নবী (সা.) রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করাকে শুধু নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখেননি, বরং এটিকে সামাজিক ঐক্যের চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেন। নিয়মিত আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, দূরবর্তী স্বজনদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সুখ-দুঃখে অংশীদার হওয়া সমাজের পারিবারিক মেলবন্ধনকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
চতুর্থত, নিঝুম রাতে নামাজ আদায় করার কথা বলা হয়, যা আত্মিক শক্তির উৎস। সামাজিক দায়িত্ব পালনের তিনটি বাস্তবমুখী নির্দেশের সঙ্গে নবীজি (সা.) একটি আত্মিক আমল যুক্ত করেন—‘রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো।’ বাহ্যিক সমাজসেবা ও দানশীলতা মানুষকে অনেক সময় অহংকারী বা ক্লান্ত করে তুলতে পারে। রাতের নিভৃতে পরম স্রষ্টার সঙ্গে একান্তে কথোপকথন বান্দার অন্তরে এক সঞ্জীবনী শক্তি জোগায়।
মতামত (0)