সারাদেশ

খুলনাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত: লোডশেডিংয়ে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন

খুলনাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত: লোডশেডিংয়ে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন
খুলনাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত: লোডশেডিংয়ে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন
তীব্র গরমের মধ্যে খুলনাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তীব্র গরমের মধ্যে খুলনাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জনজীবন ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় শিল্প খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানিয়েছেন, গত ৩০ আগস্ট সকাল ১০টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫২২ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৪০৬ মেগাওয়াট। এতে ১১৬ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।

একই সময়ে বরিশাল জোনে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৫ মেগাওয়াট। দুই জোনে মোট ৬৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৩১ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া যায়। এতে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট।

ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট খুলনায় ৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। এছাড়া বাগেরহাটে ৪, নড়াইলে ২, মাগুরায় ৮, কুষ্টিয়ায় ১০, ঝিনাইদহে ১৩, চুয়াডাঙ্গায় ১, ফরিদপুরে ৮, রাজবাড়ীতে ১৪, মাদারীপুরে ৬, শরীয়তপুরে ২ এবং গোপালগঞ্জে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখা গেছে। বরিশাল বিভাগের বরিশালে ১৯, ঝালকাঠিতে ৩, পিরোজপুরে ৩, বরগুনায় ২ এবং ভোলায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

নগরীর টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, গত শনিবার বিকেল থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার বিদ্যুৎ চলে গেছে। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ এলেও সর্বোচ্চ ২০ মিনিট পর আবার চলে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নগরবাসী জানিয়েছেন, রাতে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইন ক্লাস, অফিসের কাজ ও ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় মিল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে এক ধরনের ‘ইকোনমিক টর্চার’ শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সারা বিশ্ব সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত বিকল্প বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। যারা সৌরবিদ্যুৎ আমদানি করবে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

কুদরত-ই-খুদা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে নতুন করে নির্মাণ করা ছয়তলার বেশি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তার দাবি, একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। খুলনায় কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানান তিনি। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণে নগরীতে গণপরিবহন ব্যবস্থা কাক্সিক্ষতভাবে গড়ে ওঠেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। বড়পুকুরিয়াসহ দেশের বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিছু ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

এছাড়া আদানি পাওয়ার কেন্দ্র থেকেও পুরো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গরম ও আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি মধ্যরাতে বা অন্যান্য সময়ে অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণেও বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।

বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...