প্রযুক্তি

কিডনি রোগ শনাক্তকরণে আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের নতুন এআই প্রযুক্তি

কিডনি রোগ শনাক্তকরণে আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের নতুন এআই প্রযুক্তি
কিডনি রোগ শনাক্তকরণে আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের নতুন এআই প্রযুক্তি
আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের গবেষকরা কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ ও মূল্যায়নে তিনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এটি ক্লিনিক্যাল ডেটা বিশ্লেষণ, সিটি স্ক্যান শ্রেণিবিন্যাস এবং থ্রিডি টিউমার পরিমাপে সহায়তা করবে।

ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মাদ্রাজ (আইআইটি মাদ্রাজ) এবং ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি), ভেলোরের গবেষকরা কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ ও মূল্যায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক তিনটি নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। অনেক সময় কিডনি রোগ নীরবে অগ্রসর হয়, ফলে গুরুতর ক্ষতি হওয়ার আগে রোগীরা বিষয়টি জানতে পারেন না। এই নতুন প্রযুক্তি চিকিৎসকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

এই গবেষণাটি আইআইটি মাদ্রাজের অধ্যাপক জি. এল. স্যামুয়েল এবং গবেষক জেনিফার ডিলাইটার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। সিএমসি ভেলোরের অধ্যাপক সন্তোষ ভারুগিস এতে সহযোগিতা করেছেন। গবেষক দলটি কিডনি মূল্যায়নের তিনটি ভিন্ন ধাপের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।

প্রথম প্রযুক্তিটি ক্লিনিক্যাল ও ল্যাবরেটরি তথ্য ব্যবহার করে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে। এটি একটি মেশিন-লার্নিং মডেল, যা রোগীর ডেটা বিশ্লেষণ করে। গবেষকরা চিকিৎসকদের জন্য একটি ব্যবহারবান্ধব প্রোটোটাইপ ইন্টারফেসও তৈরি করেছেন।

দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি একটি ডিপ-লার্নিংভিত্তিক সিটি ইমেজ ক্লাসিফায়ার। এটি ১২ হাজারেরও বেশি কিডনির ছবি ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত হয়েছে। এই প্রযুক্তি স্বাভাবিক কিডনি, কিডনি সিস্ট, কিডনিতে পাথর এবং কিডনি টিউমার—এই চারটি শ্রেণিতে কিডনিকে শনাক্ত করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রোলজির ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব নেফ্রোলজিতে কিডনির সিটি-ভিত্তিক এই মাল্টিক্লাস শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়েছে।

তৃতীয় প্রযুক্তিটি সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে রোগীর নির্দিষ্ট কিডনির থ্রিডি মডেল তৈরি করে। এর মাধ্যমে কিডনিতে টিউমারের আয়তন এবং কিডনির কত শতাংশ অংশ আক্রান্ত হয়েছে, তা হিসাব করা সম্ভব। এই পরিমাপ পদ্ধতি রোগের বিস্তার সম্পর্কে একটি বিস্তৃত ধারণা দিতে সক্ষম।

অধ্যাপক জি. এল. স্যামুয়েল বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল এমন বুদ্ধিমান ব্যবস্থা তৈরি করা যা চিকিৎসকদের দ্রুত ও আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। তিনি আরও জানান, ক্লিনিক্যাল জ্ঞানের সঙ্গে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে এই প্রযুক্তিগুলো কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্তকরণে এবং রোগীর জন্য বিস্তারিত তথ্য প্রদানে চিকিৎসকদের সহায়তা করবে।

গবেষক জেনিফার ডিলাইটা উল্লেখ করেন, কিডনি রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এআই প্রযুক্তিগুলো ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের আগেভাগে শনাক্ত করতে এবং কার্যকরভাবে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সহায়তা করতে পারে। তিনি রোগী-নির্দিষ্ট ইমেজিং প্রযুক্তিকে বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক বলে বর্ণনা করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৭ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত। সংস্থাটি কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সহজ রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়। ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, তাই এই প্রযুক্তিগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিগুলো একটি ‘কিডনি ডিজিটাল টুইন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি একজন রোগীর কিডনির একটি ভার্চুয়াল প্রতিরূপ হবে। এর মাধ্যমে চিকিৎসকরা রোগের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে পারবেন।

তবে এই প্রযুক্তিগুলো এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে বৃহত্তর ও অতিরিক্ত রোগী-তথ্য ব্যবহার করে এগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

নিয়মিত ও সময়মতো পরীক্ষা করলে কিডনির গুরুতর ক্ষতি হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের এই গবেষণা কিডনি চিকিৎসায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক অগ্রগতি। এসব প্রযুক্তি চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...