জাতীয়

কোরআন শিক্ষা: একটি আত্মিক ও জীবনব্যাপী সাধনা

কোরআন শিক্ষা: একটি আত্মিক ও জীবনব্যাপী সাধনা
কোরআন শিক্ষা: একটি আত্মিক ও জীবনব্যাপী সাধনা
পবিত্র কোরআন শিক্ষা মুসলিমদের জন্য একটি আত্মিক যাত্রা, যা আরবি বর্ণমালা চেনা থেকে শুরু করে তাজবিদের মাধ্যমে শুদ্ধ উচ্চারণে পাঠ শেখার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তোলে।

একজন মুসলিমের জন্য আরবি হরফ চেনা থেকে শুরু করে শুদ্ধ উচ্চারণে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন পাঠ শিখতে পারা আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসার এক অপার্থিব বন্ধন গড়ার যাত্রা। এই শিক্ষাপথে প্রথম কোরআন শিক্ষকের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা সাধারণত মধুর হয়।

পবিত্র কোরআন শিক্ষার সূচনা ঘটে ছোট সুরাগুলো মুখস্থ করা এবং আরবি বর্ণমালা আয়ত্ত করার মধ্য দিয়ে। বর্ণমালা চেনার জন্য বারবার খাতায় হরফ লেখার অনুশীলন চোখ ও হাতকে আরবি লিপির সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। কোরআনের আরবি বর্ণমালা শেখার প্রথম ধাপকে ‘কায়েদা’ বলা হয়।

একইসাথে শিখতে হয় উচ্চারণ–রীতি বা তাজবিদ। তাজবিদ নির্দেশিকার সাহায্য নেওয়া হলেও একজন শিক্ষকের সান্নিধ্য ছাড়া সঠিক মাখরাজ অর্থাৎ উচ্চারণস্থল ও নির্ভুল উচ্চারণ শেখা প্রায় অসম্ভব।

বই বা আধুনিক কোনো মাধ্যম নিজে দেখে পড়া যেতে পারে, কিন্তু শিক্ষকের মুখের ঠোঁটের গঠন দেখা ও সঠিক ধ্বনি শোনা অপরিহার্য। নিজের ভুলের সংশোধন করে নেওয়াই হলো শুদ্ধ তেলাওয়াতের আসল চাবিকাঠি। নতুন কোনো ভাষায় অভ্যস্ত হওয়ার সময় কিছু হরফ সহজে উচ্চারণ করা গেলেও কিছু হরফের জন্য বারবার অনুশীলনের প্রয়োজন হয়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে তা শেখায়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭) যে ব্যক্তি দক্ষতার সঙ্গে কোরআন পড়ে, সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ঠেকে ঠেকে কষ্ট করে কোরআন পড়ে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৯৮)

কোরআন শেখার পথটি দ্রুতগতির কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের একটি দীর্ঘ যাত্রা। বর্ণমালার যুক্তরূপ চেনা, জের-জবর-পেশ এবং হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরবর্ণের পার্থক্য বজায় রেখে পড়তে প্রথমদিকে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

অনেক সময় পড়ার ধীরগতির কারণে মনে অস্থিরতা আসতে পারে। তবে ইসলামে এই চেষ্টা ও কষ্টের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য রয়েছে বিপুল সওয়াব। পড়ার পাশাপাশি মনোযোগ দিয়ে ভালো ক্বারিদের কোরআন শোনার অভ্যাস করলে তেলাওয়াত সুন্দর হয়ে ওঠে।

নিয়ম করে প্রতিদিন কাজের ফাঁকে কিংবা রাতে ঘুমানোর সময় শুনলে শব্দের সঠিক উচ্চারণ এবং টান মনের অজান্তেই হৃদয়ে গেঁথে যায়। কোরআন শেখা কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়ে যাওয়া বিষয় নয়; এটি সারা জীবনের এক চলমান সাধনা।

ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষকের কাছে গিয়ে নিজের পড়া সংশোধন করে নেওয়া এবং দুর্বল হরফগুলোর উচ্চারণ সুন্দর করার চেষ্টা সবসময় বজায় রাখা উচিত। নিজে কিছু অংশ মুখস্থ করা এবং নিয়মিত তেলাওয়াত বজায় রাখা এই চেষ্টারই অংশ।

কোরআন পড়তে শেখা হলো একটি সুবিশাল ভবনের প্রথম ধাপে পা রাখা। এর পরের ধাপগুলো হলো—কোরআনের অর্থ বোঝা, কোরআনের ভাবাবেগ ও অনুশাসন উপলব্ধি করা এবং সেই শিক্ষা নিজের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা।

আল্লাহ–তাআলার পরিকল্পনা কত চমৎকার, তা জীবনের দীর্ঘ ব্যবধানে বোঝা যায়। একসময় যে শিক্ষার্থী ভেবেছিল সে কোনোদিনই অন্যকে শেখানোর যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না, এক সময় যখন সে–ই শিক্ষকের জায়গায় দাঁড়ায়, তখন উপলব্ধি হয় কেন তার প্রথম শিক্ষক এত নিখুঁতভাবে তাজবিদ শিখিয়েছিলেন এবং বারবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

যখন সমাজে অন্য কেউ শেখানোর মতো থাকে না, তখন অর্জিত বিদ্যা দিয়ে সমাজের সেবা করা ইমানি কর্তব্যে পরিণত হয়। মহান আল্লাহ কোরআনের প্রথম ওহিতেই পড়ার তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, "পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" (সুরা আলাক, আয়াত: ১)

পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের চরিত্র ও আচরণে ফুটিয়ে তোলাই হলো চূড়ান্ত লক্ষ্য। আয়েশা (রা.)-কে নবীজির চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, "কোরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৬) অর্থাৎ মহানবী (সা.) ছিলেন যেন এক জীবন্ত কোরআন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...