ধর্মভগ্ন হৃদয়ের প্রশান্তি: জাপানি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
ভগ্ন হৃদয়ের প্রশান্তি: জাপানি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
জাপানি কিনৎসুকুরোই শিল্পে ভাঙা পাত্র সোনা দিয়ে জোড়া লাগানোর মতো, ইসলামে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা দিয়ে ভগ্ন হৃদয় মেরামত করার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ ‘আল-জাব্বার’ হিসেবে মানুষের অপূর্ণতা পূরণ করেন।
হাত থেকে অসাবধানতাবশত কাচ, মাটি বা সিরামিকের কোনো পাত্র মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলে সাধারণত মন খারাপ হয়। এরপর ভাঙা টুকরাগুলো জড়ো করে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। তবে জাপানি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে ভিন্ন।
জাপানিরা কোনো ভাঙা পাত্রের টুকরা ফেলে দেয় না। তারা প্রতিটি ফাটল ও জোড়ামুখ সোনা বা রুপার গুঁড়া মেশানো বিশেষ রেজিন দিয়ে নিখুঁতভাবে জুড়ে দেয়। এই পদ্ধতিকে ‘কিনৎসুকুরোই’ বা সোনার প্রলেপে মেরামত বলা হয়।
পাত্রটিতে ফাটল যত বেশি থাকে, সোনার প্রলেপ সেখানে তত বেশি লাগে। এটি এক অনন্য শিল্পকর্মে রূপ নেয়। ভাঙনচিহ্ন আড়াল করার বদলে তারা সেটিকে গর্বের সঙ্গে দৃশ্যমান করে তোলে।
একজন বিশ্বাসী মানুষের দৃষ্টিতে এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সত্যের রূপক। দুঃখ-কষ্ট মানুষকে অহমিকা ভেঙে আল্লাহর সামনে সমর্পিত হওয়ার সুযোগ দেয়। যখন সব অবলম্বন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন সেজদায় অশ্রুসিক্ত চোখে মানুষ বলে, ‘আল্লাহ, আপনি ছাড়া তো আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।’
জীবনচলার পথে নানা কারণে মানুষের অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কোনো বড় ব্যর্থতা, প্রিয়জনকে হারানো, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, তীব্র মানসিক একাকিত্ব কিংবা অতীতের ভুলের অনুশোচনা মনকে ক্ষতবিক্ষত করে। মানুষ তখন ভাবে, ‘আমার সবকিছু বুঝি শেষ হয়ে গেল?’
কিন্তু জীবনসংগ্রামের সেই দুঃসহ বেদনার মুহূর্তেও পরম করুণাময় আল্লাহ বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না। বরং এই দুঃখ-কষ্টই মানুষকে অহমিকা ভেঙে আল্লাহর সামনে সমর্পিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সব অবলম্বন ব্যর্থ হলে সেজদায় অশ্রুসিক্ত চোখে বান্দা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।
প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আকাশে ঘন মেঘ জমাট বাঁধে, তারপর ভেঙে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। মেঘের আত্মবিসর্জনই শুষ্ক মৃত জমিনে নতুন প্রাণের স্পন্দন এনে দেয়। জীবনের কিছু কিছু ভাঙন তাই ধ্বংসের শেষ অধ্যায় নয়; বরং নতুন দিগন্তের উন্মোচন।
আল্লাহ–তাআলার একটি গুণবাচক নাম হলো ‘আল-জাব্বার’। এর একটি অর্থ যেমন পরাক্রমশালী ও মহাশক্তিময়, তেমনি আরবি ‘জাবর’ শব্দমূলের আরেকটি অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো, অপূর্ণতা দূর করা এবং ক্ষতিগ্রস্তকে পরম মমতায় পূর্ণতা দেওয়া। অর্থাৎ তিনি এমন এক সত্তা, যিনি বান্দার ভগ্ন হৃদয়কে স্বীয় প্রজ্ঞা ও রহমতের পরশে পুনরুদ্ধার করেন।
রাসুল (সা.) দুই সেজদার মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত বৈঠকে যে দোয়া পড়তেন, সেখানে এই শব্দটির সরাসরি প্রয়োগ রয়েছে। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মাগফির লি, ওয়ারহামনি, ওয়াজবুরনি, ওয়াহদিনি, ওয়ারজুকনি’। এর অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমার ভাঙন ও অপূর্ণতা পূরণ করে দিন (ওয়াজবুরনি), আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৫০)
নামাজের প্রতিটি রাকাতে দুই সেজদার মাঝে মুমিন এভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। আল্লাহ অন্তরের গহিনের সব ভাঙচুর জানেন এবং তা মেরামত করার অসীম ক্ষমতা রাখেন। ‘কিনৎসুকুরোই’ শিল্পে ভাঙা মাটির পাত্র জোড়া লাগাতে সোনা ব্যবহার করা হয়।
একজন মুমিনের ভাঙা অন্তর জোড়া লাগানোর খাঁটি উপাদান হলো—সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা), তওবা ও ইস্তিগফার (অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনা) এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা (রেজা বিল কাজা)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই আশ্চর্যজনক! তার সবকিছুতেই কল্যাণ নিহিত থাকে। যদি সে সুখ ও আনন্দের মুখ দেখে, তবে শোকর আদায় করে—তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য (সবর) ধারণ করে—সেটিও তার জন্য মহা কল্যাণের কারণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
জাপানি শিল্পে সোনা হলো উপাদান আর মানুষ কারিগর। কিন্তু বিশ্বাসীর জীবনে আত্মিক উপাদানগুলোর সমন্বয়ে ভাঙা মনকে নতুন করে গড়ে তোলার আসল কারিগর হলেন আল্লাহ নিজেই। বান্দা যত নিষ্ঠার সঙ্গে সবর ও তাওয়াক্কুল আঁকড়ে ধরবে, আল্লাহর রহমতের প্রলেপে তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয় তত বেশি প্রজ্ঞাময় ও দৃঢ় হয়ে উঠবে।
আঘাত পাওয়ার পর জীবনটা সব সময় হুবহু আগের জায়গায় ফিরে আসে না। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ফিরে আসে না এবং কোনো কোনো ক্ষতের দাগ সারা জীবন রয়ে যায়।
মতামত (0)