ধর্ম

ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা

ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা
ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা
ইসলামের মূল শিক্ষা, দর্শন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে ছড়ানো নানা অপপ্রচার ও ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে একটি প্রতিবেদন।

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে এর মূল শিক্ষা, দর্শন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অভাব, একপেশে গণমাধ্যম এবং পক্ষপাতমূলক বয়ানের কারণে অনেকের মনেই ইসলাম সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে।

অনেকে মনে করেন ইসলাম সহিংসতা উসকে দেয়, নারীর অধিকার খর্ব করে, কোরআন মানুষের রচিত সাহিত্য কিংবা ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে সমর্থন করে। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে সত্য অনুসন্ধান করলে এসব প্রচারণা ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত বলে প্রতীয়মান হয়।

ইসলাম সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, ‘আল্লাহ’ কোনো বিশেষ উপজাতীয় বা প্রাচীন আরবের ‘চাঁদের দেবতা’। এটি মূলত ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক সত্য বিকৃতির ফল হিসেবে বিবেচিত। ‘আল্লাহ’ একটি আরবি শব্দ, যা মূলত ‘আল-ইলাহ’ থেকে এসেছে। আরবিভাষী খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও স্রষ্টা বোঝাতে প্রাচীনকাল থেকেই ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করে আসছেন।

পবিত্র কোরআনের শুরুতে সার্বজনীন রবের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ (সুরা ফাতিহা, আয়াত: ২) তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রভু নন; তিনি সমগ্র সৃষ্টির একক অধিপতি। একইভাবে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া কোনো প্রতিমা বা পাথরপূজা নয়। এটি বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ভৌগোলিক ও আত্মিক ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। মুসলিমরা কাবার ইবাদত করে না, বরং কাবার একমাত্র রবের ইবাদত করে।

মহানবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে ইতিহাসে বহু অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। কোনো কোনো মহলে তাঁকে তরবারির জোরে ধর্ম প্রচারকারী কিংবা নিছক রাজনৈতিক শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মক্কার চরমতম নির্যাতন ও ১৩ বছরের অবর্ণনীয় কষ্টের মুখেও তিনি অহিংসার পথ ত্যাগ করেননি।

মদিনায় তিনি যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল পারস্পরিক চুক্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ–তাআলা নবীজিকে সমগ্র পৃথিবীর জন্য করুণার দূত হিসেবে ঘোষণা করে বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)। তাঁর বিনয়, সততা, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে ক্ষমা করার মানসিকতা এবং চরিত্রমাধুর্যই কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল।

কোরআনের উৎস নিয়ে বিরোধীরা বারবার বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। কখনো দাবি করা হয়েছে এটি মুহাম্মদের স্বরচিত কাব্য, কখনো বলা হয়েছে এটি পূর্ববর্তী তাওরাত বা ইঞ্জিলের রূপান্তর। ঐতিহাসিক সত্য হলো, মহানবী (সা.) ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ‘উম্মি’। পবিত্র কোরআন কোনো মানুষের চিন্তা নয়, বরং ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাজিল হওয়া মহান আল্লাহর বাণী।

কোরআনের সাহিত্য মান ও অলৌকিক চ্যালেঞ্জ আজও অক্ষুণ্ণ। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি আমার বান্দার ওপর যা নাজিল করেছি, তাতে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩)। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর কোনো ভাষাবিদ বা সাহিত্যিক কোরআনের একটি ছোট সুরার সমতুল্য কিছু রচনা করতে পারেনি। আল্লাহ নিজেই এই গ্রন্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৯)।

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইসলামকে প্রায়ই ‘উগ্রবাদ’ ও সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ‘ইসলাম’ শব্দের মূল ধাতুই হলো ‘সিলম’, যার অর্থ শান্তি ও আত্মসমর্পণ। কোরআনে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের যে বিধান এসেছে, তা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষা ও আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। কোরআনের ঘোষণা, ‘ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬)।

ইসলাম সম্পর্কে আরেকটি ভুল ধারণা হলো যে এটি নারীকে শৃঙ্খলিত করে। সপ্তম শতকে যখন গোটা বিশ্বে নারীকে ভোগ্য পণ্য মনে করা হতো এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, তখন ইসলাম নারীকে স্বাধীন সত্তা, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, শিক্ষার অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছিল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...