ধর্মমানুষের স্বভাব: ইসলামে ভালো ও মন্দের ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা
মানুষের স্বভাব: ইসলামে ভালো ও মন্দের ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা
ইসলাম মানুষের প্রকৃতিকে জন্মগত পাপী বা সম্পূর্ণরূপে নিষ্পাপ হিসেবে দেখে না; বরং সত্য ও কল্যাণ গ্রহণ এবং মন্দ নিয়ন্ত্রণ করার দ্বৈত প্রবণতা নিয়ে জন্ম নেয়।
ইসলাম মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি সুষম ধারণা প্রদান করে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষকে জন্মগতভাবে পাপী হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। একই সাথে, তাকে এমন নিষ্পাপ সত্তাও বলা হয়নি, যার মধ্যে মন্দ কাজের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই।
মানুষের অভ্যন্তরে আল্লাহ এমন এক স্বভাব সৃষ্টি করেছেন, যা সত্য ও কল্যাণকে গ্রহণ করতে সক্ষম। তবে তার মধ্যে প্রবৃত্তি, কামনা ও দুর্বলতাও বিদ্যমান। তাই মানুষের জীবন তার ভেতরের ভালোকে জাগিয়ে তোলা এবং মন্দ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করার এক নিরন্তর সাধনা।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানুষের স্বভাবের কয়েকটি দিক বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। মানুষ 'ফিতরাত' বা এক স্বাভাবিক প্রবণতার ওপর জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন, "তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।" (সুরা রুম, আয়াত: ৩০)
রাসুল (সা.) বলেছেন, "প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।" এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৫) এর অর্থ হলো, মানুষের প্রথম স্বভাব সত্যবিমুখ নয়; তার ভেতরে সত্যকে গ্রহণ করার একটি স্বাভাবিক প্রস্তুতি থাকে। শিশুর হৃদয় নানা কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত থাকে, পরে পরিবার, পরিবেশ ও সমাজ তার চিন্তা ও চরিত্রকে বিভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।
মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ উভয় প্রবণতাই বিদ্যমান। আল্লাহ-তাআলা বলেন, "অতঃপর তিনি তাকে তার পাপপ্রবণতা ও তাকওয়ার জ্ঞান দিয়েছেন।" (সুরা শামস, আয়াত: ৮) এর ফলে মানুষের ভেতরে ভালো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেমন থাকে, তেমনি মন্দের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
মানুষ সত্য বলতে পারে, আবার মিথ্যাও বলতে পারে। সে ক্ষমা করতে পারে, আবার প্রতিশোধও নিতে পারে। দান করতে পারে, আবার সম্পদের মোহেও ডুবে যেতে পারে। ইসলামের নৈতিক শিক্ষা মানুষের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গড়ে উঠেছে। মানুষের ভেতর থেকে কোনো একটি প্রবণতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং তার ভালো দিকটিকে শক্তিশালী করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য।
'নফস' বা মানুষের প্রবৃত্তি তাকে মন্দের দিকে প্রবলভাবে নির্দেশ দেয়। আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই নফস মন্দের প্রতি প্রবলভাবে নির্দেশ দেয়।" (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩) মানুষের ভেতরে এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা থাকে যা তাকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে।
রাগের সময় প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে, সম্পদ পেলে আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে, ক্ষমতা এলে কর্তৃত্বের নেশা তৈরি হয় এবং প্রশংসা পেলে অহংকার জন্ম নিতে পারে। এ কারণেই আত্মশুদ্ধি ইসলামি জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুল (সা.) বলেছেন, "শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
পরিবেশ মানুষের চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শিশু কীভাবে কথা বলবে, কীভাবে আচরণ করবে, কোন বস্তুকে ভালো মনে করবে, এসবের ওপর তার পরিবার ও পরিবেশের গভীর প্রভাব থাকে। নবীজি (সা.) বাবা-মায়ের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তনের বিষয়টি বুঝিয়েছেন।
এ কারণেই ইসলাম পরিবারকে মানুষের চরিত্র নির্মাণের প্রথম শিক্ষালয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। ভালো সঙ্গ মানুষকে ভালো পথে টেনে নেয়। মন্দ সঙ্গ ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও নৈতিক সংবেদনশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। কোরআন সতর্ক করে বলেছে, "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।" (সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯)
মানুষকে ফেরেশতার মতো ভুলহীন করে সৃষ্টি করা হয়নি। রাসুল (সা.) বলেছেন, "আদম সন্তান সবাই ভুলকারী; আর উত্তম ভুলকারীরা হলো যারা তওবা করে।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯) এখানে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি শিক্ষা রয়েছে।
মানুষের ভালো হওয়া মানে এই নয় যে সে কখনো ভুল করবে না। ভুলের পর সে কোন দিকে ফিরে যায়, সেটিও তার চরিত্রের অংশ। আদম (আ.)-এর ঘটনাতেও দেখা যায়, ভুলের পর তিনি আল্লাহর দিকে ফিরে গেছেন। আল্লাহ বলেন, "অতঃপর আদম তাঁর প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী লাভ করলেন। ফলে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন।" (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭)
মানুষের বিবেক সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝে। আল্লাহ বলেন, "আমি কি তাকে দুটি পথ দেখাইনি?" (সুরা বালাদ, আয়াত: ১০) মানুষের সামনে ভালো ও মন্দের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তার ভেতরে একটি নৈতিক অনুভূতিও রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, "পুণ্য হলো যা তোমার অন্তরকে প্রশান্ত করে; আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে, যদিও মানুষ তোমাকে তার বৈধতার ফতোয়া দেয়।" (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৮০০১) তাই বিবেককে জীবিত রাখা জরুরি।
মতামত (0)