ধর্ম

নবীজির দাম্পত্য জীবন: ভালোবাসার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

নবীজির দাম্পত্য জীবন: ভালোবাসার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
নবীজির দাম্পত্য জীবন: ভালোবাসার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
নবীজি (সা.) তার প্রাত্যহিক আচরণ ও বাণীর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও যত্নের অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন। স্ত্রীর প্রতি উন্মুক্ত ভালোবাসা প্রকাশ, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে তিনি এক আদর্শ পারিবারিক জীবন দেখিয়েছেন।

নবীজি (সা.) একজন রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজ সংস্কারক হওয়ার পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনেও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি তার প্রাত্যহিক আচরণের মাধ্যমে শিখিয়েছেন কীভাবে দাম্পত্যের সূক্ষ্ম আবেগ ও কোমলতা বজায় রাখতে হয়। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকট তোমাদের চেয়েও উত্তম।” এই হাদিসটি সুনান ইবনে মাজাহ-এর ১৯৭৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা মনের ভেতরে গোপন না রেখে প্রকাশ্যে জানানোর বিষয়টি তিনি অকপটে দেখিয়েছেন। একবার সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?’ উত্তরে তিনি কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই ‘আয়েশা’ বলেন। এরপর পুরুষদের মধ্যে প্রিয় কে জানতে চাইলে তিনি ‘তার পিতা (আবু বকর)’ বলে জানান। এই ঘটনা সহিহ বুখারীর ৩৬৬২ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে।

ভালোবাসার এই প্রকাশ কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেও প্রতিফলিত হতো। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি ঋতুবতী অবস্থায় পাত্র থেকে পানি পান করার পর মহানবী (সা.) ঠিক সেই জায়গায় নিজের মুখ রেখে পান করতেন, যেখানে আয়েশা (রা.) মুখ রেখেছিলেন। এই বর্ণনাটি সুনানে নাসায়ির ৭০ নম্বর হাদিসে পাওয়া যায়।

দাম্পত্য জীবনে ছোট ছোট যত্নশীল কাজগুলো অনেক বরকত বয়ে আনে। স্ত্রীর মুখে ভালোবেসে এক লোকমা খাবার তুলে দেওয়াকে আল্লাহর কাছে মহা পুরস্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তুমি যা কিছুই ব্যয় করবে, তার জন্য তোমাকে অবশ্যই পুরস্কৃত করা হবে; এমনকি তুমি ভালোবেসে যে লোকমাটি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তার জন্যও তুমি সওয়াব লাভ করবে।” এই হাদিসটি সহিহ বুখারীর ৫৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত।

স্ত্রীর মন ভালো রাখতে নবীজি (সা.) খেলাধুলা ও শরীরচর্চামূলক আনন্দে সময় দিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক সফরে মহানবী (সা.) কাফেলাকে কিছুটা এগিয়ে যেতে বলে একান্তে তাকে ডেকে বলেন, ‘এসো, আমরা দুজন দৌড় প্রতিযোগিতা করি!’ আয়েশা (রা.) প্রথমে নবীজিকে হারিয়ে দেন। এর কয়েক বছর পর আয়েশা (রা.)-এর ওজন কিছুটা বাড়লে নবীজি (সা.) পুনরায় তার সঙ্গে দৌড়ান এবং এবার তিনি আয়েশা (রা.)-কে হারিয়ে মুচকি হেসে বলেন, ‘হে আয়েশা, এই জয় তোমার সেই আগের জয়ের প্রতিশোধ।’ ঘটনাটি সুনানে আবু দাউদের ২৫৭৮ নম্বর হাদিসে পাওয়া যায়।

বাইরে যাওয়ার সময় পরিপাটি থাকার পাশাপাশি ঘরে ফিরে স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা দাম্পত্য সম্মানের অংশ ছিল। সাহাবি শুরাইহ ইবনে হানি (রা.) আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আল্লাহর রাসুল যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতেন?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘তিনি মিসওয়াক করতেন।’ এই বর্ণনাটি সহিহ মুসলিমের ২৫৩ নম্বর হাদিসে রয়েছে। ঘরে ফিরে মুখ দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখা স্ত্রীর প্রতি গভীর যত্ন ও ভালোবাসারই প্রকাশ।

ক্লান্তির মুহূর্তে স্ত্রীর সান্নিধ্যে বিশ্রাম নেওয়া দাম্পত্যের জন্য বড় প্রশান্তি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “মহানবী (সা.) আমার কোলে মাথা রেখে হেলান দিতেন এবং পবিত্র কোরআন পাঠ করতেন, এমনকি আমি ঋতুবতী থাকা অবস্থায়ও।” এই হাদিস সহিহ বুখারীর ২৯৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত। এই আচরণ জাহেলি যুগের সেই কুসংস্কার ভেঙে দেয়, যেখানে নারীদের ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র ভেবে দূরে সরিয়ে রাখা হতো। মহানবী (সা.) এই সময়ে স্ত্রীর আরও কাছে এসে তাকে পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন।

দাম্পত্যের গভীর নৈকট্যের আরেকটি দৃষ্টান্ত ছিল স্বামী-স্ত্রীর একান্তে স্নান করা। আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি এবং আল্লাহর রাসুল একই পাত্র থেকে গোসল করতাম; আমাদের হাতগুলো একটির পর একটি পাত্রের পানিতে নামত।” এই হাদিস সহিহ বুখারীর ২৫০ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে। মাইমুনা (রা.) থেকেও অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা সুনান ইবনে মাজাহ-এর ৩৭৯ নম্বর হাদিসে পাওয়া যায়।

স্ত্রীর শখের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও নবীজি (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের অংশ ছিল। একবার ঈদের দিনে মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে একদল হাবশি যুবক ঐতিহ্যবাহী বর্শা ও ঢালের মহড়া দেখাচ্ছিল। আয়েশা (রা.) সেই খেলা দেখতে চাইলে মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে নিজের চাদর দিয়ে তাকে আড়াল করে রাখেন, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে খেলা দেখতে পারেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি নবীজির কাঁধের ওপর চিবুক রেখে খেলা দেখতে থাকলাম, যতক্ষণ না আমি নিজে ক্লান্ত হয়ে দেখতে বিরত হলাম।”

নবীজি (সা.) তার প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। যখনই ঘরে কোনো ছাগল বা দুম্বা জবাই করা হতো, তিনি খাদিজা (রা.)-এর বান্ধবীদের খুঁজে খুঁজে মাংসের অংশ উপহার পাঠাতেন। এই ঘটনা সহিহ বুখারীর ৩৮১৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...