‘ইহসান’ শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘দয়া’ বা ‘উপকার’ মনে হলেও এর ব্যাপ্তি অনেক গভীর। এর প্রকৃত অর্থ যেকোনো কাজে পরম উৎকর্ষ অর্জন করা, আচরণে নিখুঁত সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেওয়া এবং হৃদয়ের সমস্ত উষ্ণতা উজাড় করে সৃষ্টির পাশে দাঁড়ানো। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা পাঠ করে না, কিন্তু মানুষ তাদের স্তুতিগান উপলব্ধি করতে পারে না।
মানুষ যখন হৃদয়ের চোখ দিয়ে এই সত্য অনুধাবন করে, তখন চারপাশের কোনো কিছুকেই আর তুচ্ছ বা অপ্রয়োজনীয় মনে হয় না। জড় পদার্থের সঙ্গেও যে মানুষের আত্মিক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত মেলে রাসুলের জীবনে। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই মক্কার এমন একটি পাথরকে আমি চিনি, নবুয়ত পাওয়ার আগে থেকেই যে আমাকে সালাম দিত; আমি আজও সেই পাথরটিকে চিনতে পারি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৭৭)
গবেষক মুহাম্মদ আস-সুওয়াইয়ানি এই বিষয়ে এক চমৎকার উপলব্ধি তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন যে, আমাদের চারপাশের এই নীরব নিসর্গের মধ্যেও অনন্ত প্রার্থনা ও সুর ধ্বনিত হচ্ছে; কিন্তু তা আবিষ্কার করতে প্রয়োজন এক সংবেদনশীল হৃদয় ও মন। আস-সুওয়াইয়ানি প্রশ্ন করেছেন, আল্লাহ কি সেই পাথরকে মানুষের ভাষা দিয়েছিলেন যার ফলে সে মুহাম্মদকে সম্বোধন করেছিল, নাকি তিনি মুহাম্মদকে এমন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছিলেন যার ফলে তিনি পাথরের ভাষা বুঝতে পেরেছিলেন? তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যেভাবেই হোক, সেই সালামের মধ্য দিয়েই মুহাম্মদ ও মক্কার প্রকৃতির মাঝে ভালোবাসার এক অবিনাশী উপাখ্যান রচিত হয়েছিল। (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ কামা জা–আত ফিল আহাদিসিস সহিহাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩, মাকতাবাতুল উবাইকান, রিয়াদ, ২০০৪)
আল্লাহ যখন মানুষকে জীবন, আলো, বাতাস আর রিজিক দান করেন, তখন তিনি কোনো কার্পণ্য করেন না। কোনো বিনিময়ের শর্ত ছাড়াই তিনি বান্দার ওপর করুণার বারিধারা বর্ষণ করেন। সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের আচরণের মূল চালিকাশক্তি কী হবে, তা কোরআনে মাত্র কয়েকটি শব্দের নির্দেশনায় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “আর তুমি মানুষের প্রতি তেমন সুন্দর আচরণ করো, যেমন সুন্দর আচরণ আল্লাহ তোমার প্রতি করেছেন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)
এই দান কেবল অর্থ বিলানোর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। কাজে সততা ও নিখুঁত দক্ষতার পরিচয় দেওয়াও ইহসান। কারও চোখের জল মোছানোও ইহসান, এমনকি কাউকে আশ্বস্ত করে একমুঠো মিষ্টি হাসি উপহার দেওয়াও ইহসানের অংশ। মানুষের বাইরে থাকা অন্য প্রাণীদের প্রতি দায়িত্ববোধ ইসলামে কেবল কাগুজে নীতিকথা নয়; বরং তা আদালতের আইনি কাঠামোর অংশ। মধ্যযুগের মুসলিম ফকিহগণ তাঁদের ফিকহগ্রন্থগুলোর ‘কিতাবুন নাফাকাত’ (ভরণপোষণ অধ্যায়)-এ এমন কিছু বিস্ময়কর নীতিমালা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।



মতামত (0)