ধর্মমুমিনের কথা বলার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
মুমিনের কথা বলার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
ইসলামে কথা বলার ক্ষেত্রে একজন বিশ্বাসী ৮টি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করেন, যা তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মিক গভীরতা প্রকাশ করে।
মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক রুচির প্রতিফলন ঘটে তার কথাবার্তায়। একজন ব্যক্তি কীভাবে কথা বলে, শব্দ নির্বাচনে কতটা সতর্ক থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় আলাপে কতটা সংযম বজায় রাখে, তা দিয়েই তার আত্মিক গভীরতা ও চরিত্রের মান নির্ধারিত হয়। ইসলাম মানুষের মুখনিঃসৃত ভাষাকে কেবল একটি সাধারণ অভ্যাস হিসেবে দেখে না; বরং একে ইমানি দায়িত্ব ও আমলনামার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) তার পাশেই নিয়োজিত থাকে। রাসুল (সা.) কথা বলার ক্ষেত্রে মুমিনের মৌলিক আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন উত্তম ও কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।
এই নীতিমালার আলোকে কথা বলার সময় একজন মুমিন কয়েকটি জরুরি বিষয় খেয়াল রাখেন। সব সত্য কথা সব সময় বা সব স্থানে উচ্চারণ করা বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। একটি কথা সত্য হলেও তা যদি সময়োপযোগী না হয়, তাহলে তা কারও অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
প্রথমত, একজন মুমিন কথার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। মুমিনের জবান কখনো অসত্য, বানোয়াট কিংবা অর্ধসত্যের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। কোনো কথা শোনামাত্রই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে প্রচার করা মিথ্যাচারের শামিল। আল্লাহ–তাআলা সত্য ও সুদৃঢ় ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়ে বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সত্য কথা বলো।
দ্বিতীয়ত, অনর্থক আলাপ বর্জন করা হয়। মুমিন সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করেন যে এই কথাটি বলা কি ধর্ম বা দুনিয়ার কোনো উপকারে আসবে? রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এমন বিষয় সম্পূর্ণ বর্জন করা, যা তার জন্য অর্থহীন বা অনর্থক।
তৃতীয়ত, অন্যের সম্মান রক্ষা করা মুমিনের দায়িত্ব। কৌতুক বা হালকা আলাপের ছলেও কাউকে খাটো করা, কারও শারীরিক ত্রুটি নিয়ে হাসাহাসি করা কিংবা কাউকে এমন কোনো উপনামে ডাকা, যা সে অপছন্দ করে—ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ পারস্পরিক সম্মান রক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, হে মুমিনগণ, কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হচ্ছে, সে উপহাসকারীর চেয়ে আল্লাহর কাছে উত্তম হতে পারে...এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।
চতুর্থত, গিবত ও অপবাদ থেকে আত্মরক্ষা করা হয়। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা দুর্বলতার আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে—ইসলামি শরিয়তে তাকে ‘গিবত’ বা পরনিন্দা বলা হয়। এমনকি বিষয়টি যদি সত্যিও হয়, তবুও তা অন্যের সামনে প্রকাশ করা মহাপাপ। আল্লাহ–তাআলা গিবতের বীভৎসতা তুলে ধরে বলেন, তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত না করে। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করো...। যদি কারও নামে এমন কোনো দোষ প্রচার করা হয় যা তার মধ্যে নেই, তবে তা হয় জঘন্য অপবাদ, যার শাস্তি আরও কঠিন।
পঞ্চমত, ক্রোধের মুহূর্তে বাক্যসংযম করা হয়। মানুষের জীবনের বহু সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে যায় রাগের মাথায় মুখ ফসকে বের হওয়া কয়েকটি অপ্রীতিকর বাক্যের কারণে। রাগের উত্তেজনায় মানুষ অনেক সময় এমন চরম কথা বলে ফেলে, যার জন্য সারা জীবন অনুশোচনায় পুড়তে হয়। তাই রাগের সময় মৌনতা অবলম্বন করা খাঁটি বীরত্বের লক্ষণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, কুস্তিতে কাউকে আছড়ে ফেলে দেওয়া ব্যক্তি প্রকৃত শক্তিশালী নয়; বরং প্রকৃত বীর ও শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
ষষ্ঠত, ভাষায় মার্জিত রূপ বজায় রাখা হয়। হক ও সত্য কথা কঠোর ও কর্কশ ভাষায় না বলে নম্র ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা ইসলামের অনুপম শিষ্টাচার। এমনকি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ জালেম ফেরাউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সময়ও আল্লাহ–তাআলা মুসা ও হারুনকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা তার সঙ্গে নরম ও কোমল ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে। হকপন্থী মানুষের ভাষাও হবে শালীন, প্রজ্ঞাময় ও হৃদয়ে আলোড়ন তোলার মতো বিনম্র।
সপ্তমত, কথা দেওয়া মুমিনের কাছে এক পরম আমানত। মুখে কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা সাধ্যমতো পূরণ করার আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে। কথার মূল্য হারিয়ে গেলে বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।
মতামত (0)